দেশটা কি আবারও অন্ধকারের দিকে হাঁটছে?

প্রিয় দেশটা কি আবারও অন্ধকারের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে? ঠিক ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মত। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে তেমনটা মনে হচ্ছে। একটা শঙ্কার জায়গা তৈরি হয়েছে। পুরো বিশ্ব যখন সামনের দিকে আগাচ্ছে, আমরা যেন পাল্লা দিয়ে দেশটাকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। গত ২৮ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াত জোটের সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা শুরু হয়েছিল সেটিকে যেন এখন সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত তথা সরকার বিরোধী জোট।

অপরদিকে সরকারও বদ্ধপরিকর যে কোনো সহিংসতা মোকাবিলায়। যদিও ইতিমধ্যে বিএনপি জামায়াত-জোটের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল এবং তিন দিনের অবরোধের সময় ভয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর অজানা আতঙ্কের কারণে সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়ার পরও মানুষ ঘর থেকে বের হয়নি। তাদের চোখের সামনে ২০১৩,২০১৪ ও ২০১৫ সাল জ্বল জ্বল করছে। মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের কথা বলে সেই দিনগুলোতে কীভাবে সাধারণ মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে, পেট্রোলবোমা মেরে জলজ্যান্ত হত্যা করা হয়েছিল সেটি আজও ভুলেনি দেশের মানুষ।

গত ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে বিএনপি কর্মীদের হামলায় একজন পুলিশ সদস্যের নির্মম মৃত্যু, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা, হাসপাতালে ভাঙচুর, অ্যাম্বুলেন্সসহ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিকদের বেধড়ক পিটুনি দিয়ে আহত করার মত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে বিএনপি-জামায়াতের ২০১৩,১৪ ও ১৫ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা।

নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২০১৩ সালের শেষভাগে বিএনপি-জামায়াত জোটের হরতাল-অবরোধে নাশকতায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছিল। নির্বাচন-পূর্ব পেট্রোলবোমার সহিংসতায় ২৫ দিনে পেট্রোলবোমা ও অগ্নিসংযোগে ১৩৩জন মানুষ দগ্ধ হয়েছিলেন। নিহত হয়েছিলেন ২৬ জন। ওই সময়ে সহিংসতায় ৩৮২টি বাস-ট্রাকে আগুন দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। রেলে নাশকতামূলক ১৪টি ঘটনায় দুটি ট্রেন লাইনচ্যুত এবং তিনটি ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আহত এবং পুলিশের ওপর ৮৫টি আক্রমণের ঘটনা ঘটে বলে পুলিশের পরিসংখ্যানে উল্লেখ আছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে বিএনপি ও জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের টানা ৯৩ দিনের অবরোধে সারাদেশে ব্যাপক নাশকতা চালানো হয়। সারাদেশে পেট্রোলবোমা, ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন ও পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়। তখন সারাদেশে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন ৬৪ জন। দগ্ধ ও আহত হয়েছেন আরও এক হাজার ৪১৩ জন।

আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলো এখনও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। পেট্রোলবোমায় দগ্ধ মুখ নিয়ে বন্দী জীবনযাপন করছেন অনেকে। কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন বহু মানুষ। এমন অনেক পরিবার সেই দিনগুলোর নৃশংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে চিরতরে হারিয়ে কিংবা সারাজীবনের জন্য কর্মক্ষমতা হারানোর ফলে সেই পরিবারগুলো এখনও জীবের ঘানি টানছে। কেউ কেউ হারিয়েছেন জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ মা-বাবাকে, হারিয়েছেন নিজের সন্তানকে। এমন হাজারো মুখ এখন অসহনীয় জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন।

পুলিশের সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তিন মাসের নাশকতায়, বোমা হামলায় মারা গেছেন ৫২ জন। অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ২৮১ জন। ককটেল ও অন্যান্য কারণে আহত হয়েছেন ৫৪৯ জন। অন্যান্যভাবে নিহত ২১ জন। ওই তিন মাসে সারাদেশে ১৩৮ জন মারা গেছেন। যাদের ৭৭ জনেরই মৃত্যু হয়েছে পেট্রোলবোমার আগুনে। ওই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৮৩০ জন।

এই যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপি-জামায়াতের কথিত আন্দোলনে নামে নৃশংসতায় ২০১৩,১৪ ও ১৫ সালে যারা আগুনে কিংবা পেট্রোলবোমার মারা গিয়েছিলেন তাদের বড় অংশই ছিলেন দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক ও বাসের যাত্রী। অথচ বিএনপি ও তার জোট শরিকরা দাবি করে আসছে তাদের এই আন্দোলন ছিলো শ্রমজীবী মানুষের দাবি আদায়ের।

বিএনপি বরাবর বলে আসছে তারা গণমানুষের দল। গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য তারা জনগণকে সাথে নিয়েই আন্দোলন করছে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের কথা বলে যেভাবে আগুনে পুড়িয়ে ও বোমা মেরে সাধারণ নিরীহ ও দিনমজুর মানুষকে হত্যার রাজনীতিতে মেতে উঠেছিল সেটির কোনো ইতিবাচক ফল কিন্তু আসেনি। বরং তাদের এই জ্বালা-পোড়াও, বোমা মেরে মানব হত্যার আন্দোলন কার্যত বিএনপির জন্যই বুমেরাং হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আর যাদের প্রাণ গেছে তাদের পরিবারগুলোই শুধু বুঝতে পেরেছে আসলে কি ক্ষতিটা তাদের হয়েছে।

এখন বিএনপি জামায়াত জোট সেই একই দাবিতে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর এক দফা দাবিতে আবারও আন্দোলন শুরু করেছে। গত প্রায় এক বছর ধরে সরকার বিরোধী এই জোট আন্দোলন করে আসছে।

এরমধ্যে জোটের প্রধান দল বিএনপি গত এক প্রায় এক বছর ধরে শান্তিপূর্ণভাবেই সরকারবিরোধী আন্দোলন করে আসছিল। সারাদেশে জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে মহানগর এবং রাজধানীতে নিয়মিত অহিংস সভা-সমাবেশ করেছে। যা সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। যদিও এসব আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আমরা দেখি নাই।

bnp

কিন্তু ২৮ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি যে মহাসমাবেশ করেছিল, সেই সমাবেশ থেকে যেন হঠাৎ করেই শান্তির রাস্তা ছেড়ে সহিংসতার পথে হাঁটতে শুরু করেছে দলটি। ওই দিন কোনো রকম উস্কানি ছাড়াই বিএনপি কর্মীরা যেভাবে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, দলটি এখন আর শান্তিপূর্ণ পথে আগাতে চাচ্ছে না। তারা দেখতে পাচ্ছে সরকার সংবিধানকে অনুসরণ করে যথাসময়েই দেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে ফেলবে।

এই অবস্থায় নির্বাচনকে ঠেকাতে বিএনপি তার পুরোনো পথ বেছে নিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা। আর সত্যি সত্যিই যদি বিএনপি ও তার মিত্ররা আগামী সংসদ নির্বাচনকে ঠেকাতে সহিংস পথ বেছে নেয় তাহলে সেটি হবে বিএনপির  জন্য আত্মঘাতী। রাজনীতিতে বিএনপির ঠিকে থাকা হবে কঠিন। তাই দলীয় নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে করে। যাতে কোনোভাবেই সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।