নভেম্বর: ফুসফুসের ক্যান্সার সচেতনতা মাস

ফুসফুসের ক্যান্সার, যে জানা বেশি প্রয়োজন

গোটা বিশ্বজুড়েই নভেম্বর মাসকে ফুসফুসের ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। এবার ফুসফুস ক্যান্সার সচেতনতা মাসের প্রতিপাদ্য হলো- শিক্ষা, ক্ষমতায়ন এবং নির্মূল। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার  অন্যতম অঙ্গ ফুসফুস, তাই বিশ্বব্যাপী ফুসফুসের ক্যান্সারের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে নভেম্বর মাসটিকে ফুসফুসের ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসাবে বিশ্বজুড়ে পালন করা হয়।

মানুষের মৃত্যুর অনেক কারণ। মানুষ দুর্ঘটনায় মারা যায়, অসুখ-বিসুখে মারা যায়। অসুস্থতার কোন লক্ষণ ছাড়া আপাত সুস্থ মানুষ হঠাৎ মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানুষের মৃত্যুর নানাবিধ কারণের মধ্যে শীর্ষে আছে হৃদরোগ। তারপর পরই আছে ক্যান্সার। প্রতি ছয়জন মৃত মানুষের মধ্যে একজনের মৃত্যুর কারণ ক্যান্সার। আর ক্যান্সারে যারা মারা যান তাদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তার মানে বিশ্বের শীর্ষ প্রাণঘাতী ক্যান্সার ফুসফুসের ক্যান্সার।

আর এই কারণেই পুরো পৃথিবীর কাছে ফুসফুসের ক্যান্সারের অন্য রকম গুরুত্ব। ফুসফুসের ক্যান্সার আমাদের আয়ু কেড়ে নেয়, স্বাভাবিক জীবনযাপনে রেশ টানে, আমাদের পঙ্গু করে দেয়। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত এক চতুর্থাংশ রোগী মাত্র পাঁচ বছরের মত বেঁচে থাকেন। অবশ্য প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা হলে এই হার ৬৫ শতাংশে দাঁড়ায়। কিন্তু তা হয় না। না হওয়ার মূল কারণ চিকিৎসকের কাছে দেরিতে আসা। প্রায় ৭০ শতাংশ রোগী যখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন ততক্ষণে রোগ ফুসফুস ছাড়িয়ে ছড়িয়ে যায়। নিরাময়ের আওতার বাইরে চলে যায়। চিকিৎসা থাকার পরও চিকিৎসক ও রোগী উভয়েই অসহায় হয়ে পড়েন। 

ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসকের কাছে দেরিতে আসার নানা কারণ, সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে বুঝতে না পারা এবং অবহেলা করা। ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রধান উপসর্গ হচ্ছে কাশি। কাশির সাথে আমরা সবাই-ই পরিচিত। কাশি হয়নি বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় কাশিতে আক্রান্ত হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। আবার ক্যান্সার ছাড়া অন্য অনেক রোগের উপসর্গ কাশি। তাই উপসর্গ হিসেবে কাশি যথাযথ গুরুত্ব পায় না। ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়ে যায়। তাই দীর্ঘ মেয়াদি কাশির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বুঝতে হবে, যে কাশি সহজে ভালো হচ্ছে না, তা গুরুতর রোগের কারণে হতে পারে। 

কাশির সাথে রক্তপাত ফুসফুসের ক্যান্সারের অন্যতম লক্ষণ। এই লক্ষণ রোগীকে আতঙ্কিত করে এবং তখন রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। ফুসফুসের ক্যান্সারের অন্যান্য লক্ষণ হচ্ছে বুকে ব্যথা, শ্বাস-কষ্ট, ক্লান্তি ও অবসাদ, ওজন হ্রাস এবং ক্ষুধা মন্দা।

ফুসফুসের ক্যান্সার শীর্ষ প্রাণঘাতি রোগ হলেও তা ঠেকিয়ে দেয়ার পথও আছে। ফুসফুসের ক্যান্সারে কারা বেশি আক্রান্ত হয়, তার খোঁজ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ধূমপানের সাথে ফুসফুসের ক্যান্সারের রয়েছে গভীর যোগ সাজশ। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ৮০ শতাংশ ধূমপান করেন অথবা করতেন। ধূমপান মানে কেবল সিগারেট নয়; সিগার, পাইপ, হুক্কাও এর অন্তর্ভুক্ত। তামাকের মধ্যে আছে নিকোটিন, এই নিকোটিন ধূমপানের আসক্তির কারণ। এ ছাড়াও তামাকে আছে কয়েক হাজার রাসায়নিক পদার্থ। এই রাসায়নিক পদার্থের অনেকে ফুসফুসের কোষের পরিবর্তন ঘটায় এবং ক্যান্সারের সৃষ্টি করে। ধূমপায়ী যে কেবল নিজের ক্যান্সারের কারণ হয় তাই নয়, তার আশেপাশে যারা থাকে তাদেরও ক্ষতি করে। তামাকের ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে অধূমপায়ীদের শরীরে প্রবেশ করে। একে আমরা বলি ‘পরোক্ষ ধূমপান’। পরোক্ষ ধূমপায়ীর ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অবশ্য সরাসরি/প্রত্যক্ষ ধূমপায়ীর চেয়ে কম। কিন্তু তা ঝুঁকিপূর্ণ নিঃসন্দেহে। 

আর আছে বায়ু দূষণ। সেটাও আমাদের ফুসফুসে ক্যান্সারের কারণ। যদিও তালিকায় পিছন দিকে। কলকারখানা ও যানবাহনের কালো ধোঁয়ার সাথে প্রতিনিয়ত নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক বাতাসে মিশে যাচ্ছে আর বাতাসের সাথে প্রবেশ করছে আমাদের ফুসফুসে, ক্যান্সারের কারণ হচ্ছে। যাদের পরিবারে সদস্যদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী আছে তারা অন্যদের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। 

ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসার সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হচ্ছে সময়। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে রোগ নিরাময় সম্ভব। সেক্ষেত্রে অপারেশন বেশ কার্যকর। যাদের শারীরিক অবস্থা অপারেশনের জন্য প্রতিকূল তাদের জন্য বিকল্প হচ্ছে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি। কিন্তু রোগ অগ্রসর হলে অপারেশনের কোনো সুযোগ থাকে না। শুধু অপারেশন অথবা শুধু কেমো-রেডিওথেরাপি কিংবা উভয়ই চিকিৎসার হাতিয়ার হতে পারে। কোনটি সঠিক হাতিয়ার হবে তা নির্ভর করে রোগের ঠিক কোন পর্যায়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তার উপর। রোগ বেশি অগ্রসর হলে, ফুসফুসের বাহিরে অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে নিরাময়ের কোনো উপায় থাকে না। 

আর এই কারণেই প্রাথমিক অবস্থায় ফুসফুসের ক্যান্সার শনাক্ত করতে পারা খুব জরুরি। লক্ষণ ও চিহ্ন স্পষ্ট হওয়ার আগেই তা ধরতে পারলে চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব। এটা অনেকটা ছাঁকনির মতো কাজ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতির নাম স্ক্রিনিং।বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এই স্ক্রিনিং করা হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নির্ধারণ করেন তা। 

কিন্তু রোগ ডেকে আনার চেয়ে রোগ ঠেকিয়ে দিতে পারাই উত্তম। আর এই কারণেই ফুসফুসের ক্যান্সার থেকে বাঁচার সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে, ধূমপান পরিহার করা। ধূমপান থেকে বিরত থাকা। পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা। বায়ু দূষণ প্রতিহত করা। 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, থোরাসিক সার্জারি বিভাগ, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং সভাপতি, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন ফর থোরাসিক সার্জারি।