ট্রাম্পের ইগো যুদ্ধের বলি হচ্ছে দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্ররা

পাশ্চাত্যের ক্ষমতার অলিন্দে বর্তমানে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমেরিকার ঘনিষ্ঠতম মিত্ররা এখন আর বন্ধ দরজার আড়ালে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে না; বরং তারা সংসদীয় মঞ্চ এবং সংবাদ সম্মেলনে উচ্চকণ্ঠে তাদের আপত্তির কথা জানাচ্ছে, আর ডোনাল্ড ট্রাম্পও সমান তালে পাল্টা চিৎকার করছেন। আট দশক ধরে সযত্নে গড়ে তোলা ট্রান্স-আটলান্টিক মৈত্রী আজ চোখের সামনেই ভেঙে পড়ছে।

এই অস্থিরতার তাৎক্ষণিক কারণ হলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ, যা ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। এই যুদ্ধ শুরুর আগে ন্যাটো সদস্য, জাতিসংঘ কিংবা ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুদের সঙ্গেও কোনো পরামর্শ করা হয়নি। তবে, এই ফাটলের কারণ শুধু কোনো একক যুদ্ধ নয়; এটি এমন এক হোয়াইট হাউসের প্রতিফলন, যা তার মিত্রদের প্রতি হয় কৌশলগতভাবে উদাসীন অথবা সরাসরি অবজ্ঞাপূর্ণ।


‘আমেরিকানদের স্পষ্টত কোনো পরিকল্পনা নেই’

এই ফাটলটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যখন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ উত্তর-পশ্চিম জার্মানির মার্সবার্গে শিক্ষার্থীদের কাছে এক অকপট মন্তব্য করেন। মার্জ বলেন, আমেরিকানদের স্পষ্টতই কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা নেই। তিনি এই সংঘাতকে আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো অতীতের মার্কিন সামরিক ব্যর্থতার সঙ্গে তুলনা করেন এবং ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে অবিবেচনাপ্রসূত হিসেবে অভিহিত করেন।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল অগ্নুৎপাততুল্য। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, মার্জ কী বলছেন তা নিজেই জানেন না এবং জার্মানিতে মোতায়েন করা ৩৬,৪৩৬ জন মার্কিন সেনা কমানোর হুমকি দেন, বাস্তবায়নও করছেন। এরপর তিনি চ্যান্সেলরকে নিজের চরকায় তেল দেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, জার্মান চ্যান্সেলরের উচিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে এবং তার নিজের বিধ্বস্ত দেশকে মেরামতে বেশি সময় দেওয়া, যেখানে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন; অন্য দেশের কাজে নাক গলানো কমান, যারা ইরানের পারমাণবিক হুমকি দূর করতে কাজ করছে। এই বাদানুবাদ সব কূটনৈতিক শিষ্টাচার ছাড়িয়ে গেছে এবং মার্কিন-ইউরোপীয় সম্পর্কের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।


স্টারমার: ‘আমি বিরক্ত’ এবং তা প্রকাশ্যে বলা

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রচুর রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সেই বিনিয়োগ এখন লোকসানের খাতায়। ইরানকে ধ্বংস করার বিষয়ে ট্রাম্পের হুমকির জবাবে স্টার্মার আইটিভিকে বলেন, ওগুলো এমন শব্দ যা আমি কখনও ব্যবহার করব না, কখনও না; কারণ আমি ব্রিটিশ মূল্যবোধ ও নীতির ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলি।

সবচেয়ে কঠোর ভাষায় স্টারমার ট্রাম্পকে ভ্লাদিমির পুতিনের পাশাপাশি বসিয়ে ব্রিটিশ অর্থনীতির বিপর্যয়ের সহ-রচয়িতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আইটিভি নিউজকে বলেন, আমি বিরক্ত যে, সারাদেশের পরিবারগুলো পুতিন বা ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের কারণে জ্বালানি বিলের ক্রমাগত ওঠানামা দেখছে। ব্রিটিশ সামরিক অংশগ্রহণের বিষয়ে স্টারমার ছিলেন অটল, আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করব না। আমি মাথা নত করব না। এই যুদ্ধে যোগ দেওয়া আমাদের জাতীয় স্বার্থে নেই এবং আমরা তা করব না।

ট্রাম্প এই অবস্থানের পাল্টা জবাব দিয়েছেন ‘দ্য সান’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, যেখানে তিনি স্টার্মারকে ‘সহায়ক নয়’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন যে ‘সম্পর্কটি এখন আর আগের মতো নেই’। আইএমএফ এই অস্থিরতার বাস্তব প্রভাব তুলে ধরে ব্রিটেনের ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০.৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যা মূলত ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ ফলাফল।


সানচেজ ও কার্নি: ইউরোপ ও কানাডার সীমারেখা

স্পেনের পেদ্রো সানচেজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে আপসহীন সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সানচেজ যখন মার্কিন বাহিনীকে স্পেনের রোটা এবং মোরোন ঘাঁটি ব্যবহার করতে বাধা দেন, তখন ট্রাম্প মাদ্রিদের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দেন। সানচেজ পিছপা হননি। যুদ্ধবিরতি আসার পর তার মন্তব্য ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ: “যুদ্ধবিরতি সবসময়ই সুখবর। কিন্তু এই মুহূর্তের স্বস্তি যেন আমাদের বিশৃঙ্খলা, ধ্বংস এবং প্রাণহানির কথা ভুলিয়ে না দেয়। যারা বিশ্বে আগুন লাগিয়ে দেয়, তারা হাতে এক বালতি পানি নিয়ে হাজির হয়েছে বলেই স্পেন সরকার তাদের সাধুবাদ জানাবে না।”

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই পরিস্থিতির কাঠামোগত ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করে সিডনির লোয়ি ইনস্টিটিউটে বলেন, ভূ-কৌশলগতভাবে আধিপত্যবাদীরা আন্তর্জাতিক নিয়ম বা আইনের তোয়াক্কা না করে কাজ করছে, যার ফল অন্যদের ভোগ করতে হচ্ছে। তিনি এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেন এবং উল্লেখ করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল জাতিসংঘ বা কানাডার মতো মিত্রদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।


আমেরিকান কণ্ঠস্বর: ‘আমরা হাসির পাত্রে পরিণত হচ্ছি’

উদ্বেগের এই সুর শুধু দেশের বাইরে থেকেই নয়, স্বয়ং আমেরিকার ভেতর থেকেও আসছে। সেনেট ডেমোক্র্যাটরা এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, যেটিকে তারা অবৈধ, অননুমোদিত এবং কূটনৈতিকভাবে বিপর্যয়কর মনে করেন।

ভার্জিনিয়ার সেনেটর টিম কেইন তার বিশ্লেষণে বলেন: “কোনো স্পষ্ট যুক্তি নেই, কোনো পরিকল্পনা নেই, মিত্রদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা নেই, এমনকি কংগ্রেসকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আপনি যখন কূটনীতিকে অসম্ভব করে তোলেন, তখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। সেনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থ এই বিপর্যয়কে আমেরিকার যুদ্ধপরবর্তী অভ্যাসের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আমাদের দায়িত্ব হলো এটি নিশ্চিত করা যে আমাদের জাতি যেন আর কখনও অহংকার-চালিত কোনো ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ জড়িয়ে না পড়ে।

যদিও ডেমোক্র্যাটদের আনা ছয়টি ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ রিপাবলিকান আনুগত্যের কারণে ব্যর্থ হয়েছে, তবুও প্রথম মাসেই ১৩ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং পেট্রোলের দাম গ্যালন প্রতি ৪.৩০ ডলারে পৌঁছানো জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

পরিণতির সময় সমাগত

ট্রাম্পের এই মিত্রদের দূরে সরিয়ে দেওয়াটা কি কোনো সুপরিকল্পিত কৌশল, নাকি শুধুই একজন নেতার আস্ফালন যিনি উদ্ধত আচরণকেই শক্তি মনে করেন—তা বিতর্কের বিষয় হলেও এর ফলাফল একই।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যখন হুমকি দেন, যারা যুদ্ধে সমর্থন দেয়নি তাদের প্রতি আমেরিকার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প পুনরায় বিবেচনা করবেন, তখন ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে এটি একটি শর্তসাপেক্ষ বন্ধুত্ব হিসেবে গণ্য হয়। আমেরিকার বন্ধুরা আজ দূরে সরে যাচ্ছে। শত্রুরা সজাগ দৃষ্টি রাখছে। আর ১৯৪৫ সালের পর এই প্রথম পাশ্চাত্য জগৎ নিশ্চিত হতে পারছে না যে, তারা ওয়াশিংটনের ওপর ভরসা করতে পারবে কি না।


(লেখক আবুধাবি টিভি এবং আল জাজিরার সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং নির্বাহী প্রযোজক। যুদ্ধ সংবাদিকতার পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের সাক্ষাৎকার ও গণমাধ্যম প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন)।