স্বৈরাচারী রাজনীতি এবং সামরিক আগ্রাসনের মিশ্রণ সবসময়ই বিপজ্জনক। গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে খুব ভোরে মার-এ-লাগোতে বসে বেসবল ক্যাপ পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন, সেই সত্যটিই যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল। এটি ছিল একক কোনো ব্যক্তির নেওয়া সিদ্ধান্ত যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই, নেই জনসমর্থন বা যুদ্ধের শেষ নিয়ে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা।
গত কয়েক মাসের মধ্যে মিস্টার ট্রাম্প ক্যারিবীয় অঞ্চলে জাহাজ উড়িয়ে দেওয়ার, ভেনেজুয়েলার নেতাকে অপহরণ করার এবং ইরানের সরকারকে নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন বা মার্কিন জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার কোনো প্রচেষ্টার অনুপস্থিতি দেখে মনে হয় এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমাদের আসলে ভাবার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না- কেন এই হামলা, এর খরচ কত বা বোমা হামলার এই রোমাঞ্চকর দৃশ্য শেষ হওয়ার পর কী ঘটবে। একটি অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এক হামলার হুমকি আসছে। এই ঝোড়ো গতিতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো বিষয়টিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে মনে হচ্ছে এটি একটি রুটিন কাজ।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি বদলে গেছে। মিস্টার ট্রাম্প এখন নিয়মিতভাবে সামরিক বাহিনীকে তার ব্যক্তিগত জেদ চরিতার্থ করার কাজে ব্যবহার করছেন। তিনি হয়তো অপারেশনটি ছোট রাখার চেষ্টা করবেন, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি এড়ানো যাবে না। আগামী কয়েক সপ্তাহে যাই ঘটুক না কেন, ৯/১১ পরবর্তী মার্কিন ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ এখন ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত হলো, এমন এক পদক্ষেপ যা আগামী বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রতিধ্বনিত হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কয়েক দশক ধরে ইরানিদের জীবনে এক দমনমূলক শক্তি ছিলেন। তার মৃত্যু এই সমস্যার সমাধান করে না যে, ৯ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষের এই দেশটিকে শেষ পর্যন্ত কারা নিয়ন্ত্রণ করবে। বিশেষ করে যখন দেখা যায় দেশটির সব থেকে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কট্টরপন্থী এবং তারা এখন তাদের ক্ষমতা ও সম্পদ হারানোর সরাসরি হুমকির মুখে।
ইরানি শাসনব্যবস্থা দুর্বল হলেও তারা এখনও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে শুরু করে ইসরাইল পর্যন্ত মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ইঙ্গিত দেয়, ইরান তাদের ওপর আসা এই সহিংসতা ও বিপর্যয়কে প্রতিবেশীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার প্রাথমিক কৌশল নিয়েছে। জ্বালানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলের ওপর আক্রমণ বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া সাইবার হামলা, সন্ত্রাসবাদ এবং প্রক্সি হামলাও একের পর এক আসতে পারে।

শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য ট্রাম্পের একমাত্র কৌশল হলো ইরানি জনগণকে জেগে ওঠার আহ্বান জানানো। কিন্তু তারপর কী? যারা জেগে উঠবে তাদের হয়তো গণহারে হত্যা করা হবে। এই শাসনব্যবস্থারই কোনো একটি অংশ ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে। অথবা আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার মতো ইরানও গৃহযুদ্ধের কবলে পড়তে পারে। জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দেশটিকে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোকেও টেনে আনবে। দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা বা চরম দারিদ্র্য আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপে শরণার্থীদের ঢল নামাতে পারে।
অবশ্যই কিছু ভালো সম্ভাবনাও থাকে। যেমন- দুর্বল হয়ে পড়া বর্তমান সরকার আমেরিকার সাথে কোনো সমঝোতায় আসতে পারে। অথবা দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মতো ইরান হয়তো শান্তিপূর্ণভাবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে, যদিও এই সম্ভাবনা খুবই কম।

মিস্টার ট্রাম্প গত গ্রীষ্মের মতো এবারও ইরানে ‘বিজয়’ ঘোষণা করবেন নিশ্চিত। কিন্তু যুদ্ধ কোনো সংবাদের শিরোনামে নয়, বরং মানুষ এবং জাতির জীবনে খেলা করে। ১৯৫৩ সালে মার্কিন ও ব্রিটিশ মদদপুষ্ট অভ্যুত্থান যার মাধ্যমে ইরানের শাহ ক্ষমতা সুসংহত করেছিলেন, সেটিকেও তখন জয় মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই জেদই ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করেছিল যা আজ পর্যন্ত আমেরিকার জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমনকি যারা ইরানের বর্তমান সরকারের পতন চান, তারাও আমেরিকার এই আচরণে গভীর উদ্বেগ বোধ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইসরাইলের মতো কোনো নিয়ম মানছে না, মিত্রদের সাথে পরামর্শ করছে না এবং ধ্বংসলীলার পরিণাম নিয়ে কোনো পরোয়া করছে না। প্রাচীন সাম্রাজ্যগুলোর মতো এটিও এখন ‘ট্রিবিউট’ বা উপঢৌকন দাবি করছে- তা ভেনেজুয়েলার তেল হোক কিংবা কথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর পাওনা। ট্রাম্পের শুল্ক নীতি, সর্বোচ্চ চাপের নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রিনল্যান্ডকে হুমকির মুখে ফেলা সামরিক পদক্ষেপগুলো মূলত একটি সুপরিকল্পিত বিশৃঙ্খলার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই নতুন বাস্তবতা থেকে অন্য দেশগুলো কী শিক্ষা নেবে? যারা পারমাণবিক শক্তিধর হতে চায় তারা দেখবে যে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, ইরানের আলোচনা তা পারেনি। রাশিয়া ও চীনের জন্য শিক্ষা হলো- জোর যার মুল্লুক তার। আমাদের ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য শিক্ষা হলো- যুক্তরাষ্ট্র একটি অনিশ্চিত শক্তি যা যে কোনো সময় তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও হস্তক্ষেপ করতে পারে। আমেরিকার নেতৃত্বে চলা সেই পুরনো বিশ্বব্যবস্থা এখন মৃত। নতুন এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত অস্থির এবং অশুভ।

মিস্টার ট্রাম্পের ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বিরোধিতাই মূলত তাকে প্রেসিডেন্সিতে আসতে সাহায্য করেছিল; এটিই ছিল মাগা আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য। অথচ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর তিনি ক্ষমতার অপপ্রয়োগেই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এই সামরিক উন্মাদনা ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে আরও জোরালো এবং টেকসই বিরোধিতার দাবি রাখে।
আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী প্রবৃত্তিকে দূর করার পরিবর্তে মিস্টার ট্রাম্প সেটিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলেছেন। ভবিষ্যতে যে তিনি আবার সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। (কতজন আমেরিকান জানেন যে বড়দিনের দিন নাইজেরিয়ায় বোমা হামলা চালানো হয়েছে?) কিউবাকে বর্তমানে অবরোধের মাধ্যমে ক্ষুধার্ত রাখা হচ্ছে, যদিও তারা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নয়।
২৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের পর আমেরিকান জনগণের মধ্যে এই ধরণের হঠকারিতার আর কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। ভেনেজুয়েলা এবং ইরানের এই অপারেশনগুলোতে কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বাজেট যখন কাটছাঁট করা হচ্ছে এবং ঘাটতি যখন বাড়ছে, তখন করদাতারা তাদের টাকা এভাবে খরচ করতে চান না।
সবথেকে আশঙ্কার বিষয় হলো, মিস্টার ট্রাম্প যেভাবে বিদেশে নবগঠিত ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ ব্যবহার করছেন, তাতে প্রশ্ন জাগে তিনি দেশে সামরিক বাহিনীকে দিয়ে কী করাবেন। ইতিমধ্যেই তিনি মার্কিন শহরগুলোতে সেনা পাঠানোর চেষ্টা করেছেন কিন্তু আদালতের বাধায় তা পারেননি। তিনি ‘ইনসারেকশন অ্যাক্ট’ জারির কথা ভাবছেন, যা তাকে দেশের ভেতরে আইন প্রয়োগের জন্য সামরিক বাহিনী ব্যবহারের জরুরি ক্ষমতা দেবে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হোক কিংবা নির্বাচনে হার- যে কোনো অজুহাতে এটি মার্কিন গণতন্ত্রকে এক বিপজ্জনক পথে নিয়ে যাবে।

যদি এসব অসম্ভব মনে হয়, তবে ইতিমধ্যে যা যা ঘটেছে তা বিবেচনা করুন। মিস্টার ট্রাম্প জেনারেলদের সামনে মার্কিন শহরগুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণের ময়দান বানানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। অবৈধ নির্দেশ পালন না করার পরামর্শ দেওয়ার জন্য ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্যদের কারাবন্দি করার ডাক দিয়েছেন। এমনকি গত সপ্তাহে তিনি এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের পরিষেবা ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন কারণ তারা পেন্টাগনকে আমেরিকানদের ওপর নজরদারির জন্য তাদের প্রযুক্তিতে অবাধ প্রবেশাধিকার দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এই বারবার ও অবৈধ ব্যবহার আমাদের অনুভূতিকে যেন অসাড় করে না দেয়। মিস্টার ট্রাম্পের এই যুদ্ধের বিস্তৃতি আমাদের সমাজের যে ক্ষতি করছে তাকে তুচ্ছ করে দেখা উচিত নয়।
আমেরিকানদের জন্য এখন মৌলিক প্রশ্ন হলো- আমরা কি ধারের টাকায় এবং আমাদের সামরিক সদস্যদের ত্যাগের বিনিময়ে এই চিরস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাই? আমরা কি নিয়মিতভাবে অন্য দেশে বোমা ফেলতে চাই এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাকে ধ্বংস করে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন করতে চাই?

মিস্টার ট্রাম্পের স্বৈরাচারী মনোভাব কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। তার ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল ক্ষমতা ব্যবহারে তাকে আটকানোর মতো কেউ নেই। যুদ্ধকে কখনোই স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। আমরা জানি না এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, কিন্তু আমরা জানি এটি ইতিমধ্যে অগণিত বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে কয়েক ডজন স্কুলছাত্রীও ছিল। এই ধরণের সহিংসতার প্রতি আমেরিকানদের সংবেদনশীলতা হারানো আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষত।
জনমত, সংবিধান এবং মানবিকতার পক্ষ নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা এই চিরস্থায়ী যুদ্ধের বিকল্প পথ দেখাতে পারে। অধিকাংশ আমেরিকান একটি স্থায়ী শান্তি চায়, যেখানে সরকার তাদের সমস্যার সমাধান করবে- অন্য দেশে শাসন পরিবর্তনের অজুহাতে শত্রু নিধনের নামে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে না।
লেখক বেন রোডস ওবামা প্রশাসনের ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার ছিলেন, যখন ২০১৫ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
