নিয়ম-নীতি ছাড়াই চলছিলো শ্যামলীর সেই হাসপাতালটি

বিলের টাকা দিতে না পারায় গুরুতর অসুস্থ যমজ শিশুকে বের করে দেয়ার ঘটনায় রাজধানীর শ্যামলীতে আমার বাংলাদেশ হাসপাতালের মালিক গোলাম সরোয়ার ও পরিচালক সোয়েব খানকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব)।

শুক্রবার (৭ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এই দুঃখজনক ও মর্মান্তিক ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন অভিতাজ এই বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ও মুখমাত্র খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, দালালদের মাধ্যমে হাসপাতালটি জানতে পারে ওই যমজ শিশুর বাবা সৌদি আরবে থাকেন। তাদের উচ্চাশা ছিলো অনেক মুনাফা তাদের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব। পরবর্তীতে যখন দেখেছে ৪০ হাজার টাকার বেশি আপাতত দিতে পারছেন না। সময় চাচ্ছে। আর রোগীর অবস্থাও কিছুটা সংকটাপন্ন ছিল। এ জন্যই জোর করে জমজ শিশুসহ মাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে এক শিশুর মৃত্যু হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে এনআইসিইউ ও আইসিইউ সাপোর্টের কথা বলে রোগীদের নিয়ে আসা হতো। পরবর্তীতে এনআইসিইউ-আইসিইউতে ভর্তি করে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লাভের আশায় বড় বিল তৈরি করে দেওয়া হতো।

বিলিং যে সিস্টেম—ভাউচার দেয়া, সেখানে কোনো বিল দেয়া হয় না। মালিক গোলাম সারোয়ার মূলত যে বিল ঠিক করেন সেটাই নেয়া হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি নিয়ম আছে, কোন বিষয়ে কত টাকা নেওয়া যাবে।

সেই অনুযায়ী হাসপাতালটিতে কোন পরীক্ষার কত খরচ সেই তালিকা ঝোলানো অবস্থায় পাওয়া যায়নি। একজন রোগীর কাছে অভিযোগ পেয়েছি, ডাক্তার বাবদ, নার্স বাবদ কত— প্রতিটি বিষয়ে বিল করা হতো। পাশাপাশি ১৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ নেয়া হতো।

খন্দকার আল মঈন বলেন, শ্যামলীর আমার বাংলাদেশ হাসপাতালে নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি পরিচালনায় যে নীতিমালা তা মেনে চলছে কি না তা দেখতে আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গিয়েছিলেন। এই হাসপাতালের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র আমরা পাইনি। সেখানে আমরা মাত্র একজন চিকিৎসক পেয়েছি, যেখানে ৩ জন চিকিৎসক থাকার কথা ছিল। আমরা একজন নার্স পেয়েছি। চিকিৎসক যাকে পেয়েছি, তিনি আইসিইউ-এনআইসিইউ বিশেষজ্ঞ না। তিনি এমবিবিএস চিকিৎসক। তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছিলেন।

তিনি আরো বলেন, গোলাম সারোয়ার জানিয়েছেন বিভিন্ন সময় হাসপাতালের কার্যক্রম সুইচ করে কখনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে হাসপাতাল বানিয়েছেন, আবার কখনো হাসপাতাল থেকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরিণত করেছেন।

ঢাকা ট্রমা, বাংলাদেশ ট্রমা হাসপাতাল, মমতাজ মেমোরিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আরাব ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মোহাম্মদীয়া মেডিকেল সার্ভিস-  এই রকম ছয়টি প্রতিষ্ঠান সারোয়ার একা বা যৌথ মালিকানায় করেছিলেন।

দুই তিন বছর পরপর বন্ধ করেছেন এবং পুনরায় নতুন লাইসেন্স নিয়েছেন নতুন হাসপাতাল করেছেন। যখনই দেখেছেন অনিয়ম ঢেকে রাখা যাচ্ছে না, তখনই তিনি সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। এই ঘটনার পর নিশ্চিতভাবেই ‘আমার বাংলাদেশ হাসপাতাল’ বন্ধ করে দেবেন।

এত অব্যবস্থাপনা নিয়ে এই গোলাম সারোয়ার কীভাবে এতোগুলো হাসপাতাল বা চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতো, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর খতিয়ে দেখবে উল্লেখ করে র‌্যাব কর্মকর্তা আরো জানান, আটক দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদে আরো অনেক কিছু জানা যাবে।

প্রসঙ্গত, রাজধানীর শ্যামলীর এই হাসপাতালে বিলের  টাকা দিতে না পারায় করায় চিকিৎসাধীন জমজ শিশুকে জোর করে বের করে দেয়ার পর আহমেদ নামে এক শিশুর নির্মম মৃত্যু ও আরেক শিশুকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

শিশুদের মা আয়েশা বেগম বাদী হয়ে শুক্রবার মোহাম্মদপুর থানায় মামলায় করেছেন। মামলায় হাসপাতালের মালিক গোলাম সরোয়ার ও পরিচালক সোয়েব খানকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে র‌্যাব সরোয়ার ও সোয়েবকে আটক করেছে

গত ৩১ ডিসেম্বর ঠাণ্ডাজনিত রোগে যমজ শিশু দুটিকে শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করেন মা আয়েশা বেগম। গত রোববার সেখানে থেকে বলা হয়েছে, তাদের এনআইসিইউতে নিতে হবে। সেখানে এনআইসিইউতে সিট পাওয়া যাচ্ছিলো না।


পরে সিদ্ধান্ত নেন, সাভারে নিয়ে যাবেন। সেই সময় হাসপাতালটির এক অ্যাম্বুলেন্স চালক বলেন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে সামান্য বেশি খরচ হবে পাশেই একটি হাসপাতালে ভর্তি করান। হাসপাতালটির নাম ‘আমার বাংলাদেশ হসপিটাল’। সোহরাওয়ার্দীতে যদি পাঁচ টাকা খরচ হয়, সেখানে সাত টাকা খরচ হবে।

সেই থেকে ওই হাসপাতালে যমজ শিশু দুটি চিকিৎসাধীন ছিলও। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছয় দিনে এক লাখ ২৬ হাজার টাকা দাবি করেন। এরমধ্যে কয়েক বারে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করেন বলে দাবি করেছেন শিশু দুটোর মা। তবে হাসপাতালের দাবি, কোন টাকা দেয়া হয়নি।

মা আয়েশা বেগম বলেন, বৃহস্পতিবার (৬ জানুয়ারি) হাসপাতালের আইসিইউ থেকে যমজ দুই শিশুকে বের করে দেয় কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে মারা যায় শিশু আহমেদ। আরেক শিশু আব্দুল্লাহও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।


একাত্তর/আরএ