উনিশ বছর আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর তখনকার বিএনপি সরকার ওই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের দায় চাপাতে চেয়েছিলো আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ওপর। উনিশ বছর পরে এসে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ওই ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বললেন, ২১ আগস্টের পুরো বিষয়টি সাজানো নাটক। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিএনপির নেতাদের ওই মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে আগামী ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে দলের অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে যৌথ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব।
ফখরুল বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়াতো শেষই করে ফেলেছে। কী আর বলবো। পুরো বিষয়টিই হচ্ছে সাজানো নাটক। যেখানে মিটিং হওয়ার কথা ছিলো, সেখানে না হয়ে অন্য জায়গায় হয়েছিলো। পুলিশকে জানানো হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘তারেক রহমানের এফআইআরএ ছিলোই না। তিনবার এফআইআর হয়েছে। তিনবারে একবারও ছিলো না। তদন্ত কর্মকর্তা আবুল কাহার আকন্দ, তিনি রিটায়ার করেছিলেন। তাকে চাকরি দিয়ে আনা হয়েছিলো। যিনি পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছেন, তার তদন্তেও তারেক রহমানের নাম উল্লেখ ছিলো না। একমাত্র মুফতি হান্নানকে ৪৫ দিন আটকে রেখে জোর করে জবানবন্দি নেয়া হয়। তবে তিনি যেন আদালতে গিয়ে কোনো কিছু বলতে না পারেন, সেজন্য অন্য মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এখানে তারেক রহমান, আব্দুস সালাম পিন্টু ও লুৎফুজ্জামান বাবর কেউই জড়িত নন।’
‘ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তারেক রহমানের নাম জড়ানো হয়েছে। বিএনপি নেতাদের নাম দেয়া হয়েছে। ২১ শে আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কলঙ্কজনক ঘটনা। আমরা নিন্দা জানাই। তবে পরবরর্তীতে বিএনপি নেতাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জড়ানো হয়েছে, নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। রাজনৈতিক ফায়দা লোটা হচ্ছে।’
২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিক সামনেই রাস্তার ওপর একটি ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিলো সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশের জন্য।
হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নেতাকর্মীদের তৈরি মানবঢালে সেদিন বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা।
হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ অগাস্টমারা যান। প্রায় দেড় বছর পর মৃত্যু হয় ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা হয় ২৪।
তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ওই ঘটনার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হয়। নানা নাটকীয়তার পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এ মামলার রায় দেয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, খালেদার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এছাড়া ১১ পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তার বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়।
ওই হামলার পর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, শেখ হাসিনা তার ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে সাজানো হয় জজ মিয়া নাটক।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘বিএনপি রাজনৈতিকভাবে এতটা দেউলিয়া হয়নি যে বিদেশিদের বোঝাতে হবে। ভারতের যে বার্তার বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই। নিরপেক্ষ সরকারের ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা করতেই এমন রিপোর্ট। বিএনপি জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করছে, জনগণকে সাথে নিয়ে জয়ী হবো।’
ফখরুল অভিযোগ করেন, ‘৫২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সংকটময় মুহুর্ত চলছে বাংলাদেশে। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসের মাধ্যমে সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে সরকার। সরকার জনগনের সমস্যার দিকে না তাকিয়ে শুধু বিরোধীদল দমনে ব্যস্ত।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সামনে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধীদল শূন্য করতে অবাধে গ্রেপ্তার শুরু করেছে। অতীতের মতো আবার একই কায়দায় বিএনপির সভা-সমাবেশে হামলা চালানো, অস্ত্র দিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন ‘জনগনের পকেট থেকে টাকা নিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ করে এখন নিজেদের পক্ষে সাফাই গাইছে। এদেশের মানুষ এখন মুক্তি চায়, নিজেরা ভোট দিতে চায়।’
একাত্তর/কেএসএইচ