দেশের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে একটি নিরাপদ, উদার ও গণতান্ত্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে স্বাগত জানায় বিএনপি। এক সেমিনারে দলটির মহাসচিবসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ছাড়া বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষা করা কঠিন হবে।
সোমবারের ওই সেমিনারে মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল শীর্ষক’ ওই সেমিনারের আয়োজন করে বিএনপি। এমন একসময় এই সেমিনার যখন দেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিসহ সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক নানা পক্ষের বিভিন্ন পদক্ষেপ দৃশ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে সেমিনারে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে নিজ দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন বিএনপি মহাসচিবসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা।
মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেমিনারে বলেন, সময়টা জাতির জন্য সংকটময় মুহূর্ত। খালেদা জিয়া অত্যন্ত অসুস্থ। সরকার প্রতিহিংসার কারণে বিনা চিকিৎসায় মুমূর্ষু অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে তাকে। ৭০০ জন গুম, ৪৫ লাখ আসামি। নির্বাচনের পূর্বে অনেককে সাজা দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে, কারণ বিরোধী কেউ যাতে নির্বাচন করতে না পারে, আওয়ামী লীগ একাই ক্ষমতায় যেতে চায়।
তিনি বলেন, সকল রাজনৈতিক দল মিলে এক দফার দাবি এসেছে। বিএনপি চায় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার গঠন করতে। বিএনপি বিশ্বাস করে আন্দোলনের মধ্যদিয়ে দাবি আদায় সক্ষম। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে বিএনপি।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১৭ বছরে বর্তমান সরকারের অবর্ণনীয় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যায়ের শিকার হয়েছে বিএনপি। জনগণের যে ক্ষমতা অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া হয়েছে, সেটা পুনরায় জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া বিএনপির রাজনৈতিক দায়িত্ব। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোর যথাযথ সংরক্ষণই ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির মূল ভিত্তি বলে বিএনপি বিশ্বাস করে।
খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিএনপির ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশনে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে কাতারবদ্ধ হওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করার পাশাপাশি লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম ও রাজনীতি নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশিকে স্বাধীনতা, সমতা এবং সমৃদ্ধির সকল দেশীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ বিএনপি। জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর বিএনপি।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির এ সদস্য আরও বলেন, ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা, টেকসই অর্থনীতি, মুক্ত বাণিজ্য, জলবায়ু, স্বাস্থ্য, মহামারির মত হুমকিসমূহের মোকাবিলার পাশাপাশি একটি অবাধ, মুক্ত, উদার, গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য কৌশলকে স্বাগত জানায় বিএনপি।
সেমিনারে দলটির নেতারা বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার ছাড়া গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষা করা কঠিন হবে।
সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। তবে তারা কোন বক্তব্য রাখেন নি।
ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে যেসব দেশ রয়েছে, সেগুলোকে নিয়েই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। এরমধ্যে যেমন যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে, তেমনি জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও বাংলাদেশের মতো অনেক দেশ রয়েছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি বা আইপিএস কৌশল ঘোষণা করে মার্কিন প্রেডিন্টে জো বাইডেন প্রশাসন। সেখানে প্রেসিডেন্ট বাইডেন এক অবাধ, মুক্ত, সংযুক্ত, সমৃদ্ধ এবং সুরক্ষিত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কথা ঘোষণা করেন।
এই নীতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান), কোয়াড্রিল্যাটেরাল সিকিউরিটি ডায়ালগ (কোয়াড), অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রিটেনের মতো মিত্রদেশ ও জোটকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মূলত চীনের অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব ঠেকানোই এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। যেসব দেশ মার্কিন এই কৌশলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, তাদের বেশিরভাগের সাথে চীনের নানা বিষয়ে বিরোধ রয়েছে।
জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল নিয়ে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি বা কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশও চার মৌলিক নীতিমালার আলোকে ১৫টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা এবং এ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমকে পরিচালিত করবে। সরকার এ লক্ষ্যগুলোকে সামনে রেখে গত এপ্রিলে ইন্দো-প্যাসিফিক ‘রূপরেখা’ ঘোষণা করেছে।