দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কার যেসব প্রার্থী বাছাই করেছে, সেখানে বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ হলেও ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য রয়ে গেছে।
আবার এমন কিছু প্রার্থী রয়েছেন যারা অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য সমালোচিত হয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তিন হাজার ৩৬২ জন মনোনয়ন প্রত্যাশীর মধ্য থেকে রোববার ২৯৮ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, মনোনয়নের এই তালিকা প্রথম দেখায় কিছুটা নতুন মনে হলেও আসলে এটা গতানুগতিক।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো: শাহনেওয়াজ একাত্তরকে বলেন, ‘যদিও বলা হয়েছে, অনেক নতুন প্রার্থী নেয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে এরা সবাই পূর্ববর্তী সংসদ সদস্যদের আত্মীয়-স্বজন। এইভাবে যে খুব পরিবর্তন হয়েছে, তা বলবো না।
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়া ২৯৮ জন প্রার্থীর মধ্যে অনেক রদবদল এসেছে। বর্তমান মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্যসহ ৭১ জন সংসদ সদস্য বাদ পড়েছেন। আর একেবারে প্রথমবারের প্রথমবারের মতো দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ৬৫ জন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই বিতর্কিত। অনেক মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও ব্যাপক অভিযোগ আছে।
‘যেহেতু আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হচ্ছে না, তাই যাদের মনোনয়ন দেয়া, এক অর্থে তারাই নির্বাচিত। এই অবস্থায় ভালো প্রার্থীরা যে মনোনয়ন পাবেন তা আশা করা যায় না।’
আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রাধান্য ধরে রেখেছেন দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। এবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যবসায়ী নৌকার মাঝি হয়েছেন।
এদের মধ্যে রয়েছেন- দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী পরিবার বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন, পোশাক শিল্প মালিক ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি টিপু মুনশি, আব্দুস সালাম মুর্শেদী, শিল্পোদ্যোক্তা আ হ ম মুস্তফা কামাল।
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক সভাপতি বেনজীর আহমেদ, গাজী গ্রুপের মালিক গোলাম দস্তগীর গাজী, নিটল নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা আহমেদ, বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান মোরশেদ আলম, পোশাক ব্যবসায়ী শাহরিয়ার আলম, গ্লোবের পরিচালক মামুনুর রশীদ কিরন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার কারণে দেশে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন ব্যবস্থা তৈরি করা যায়নি। একই কারণে রাজনীতিবিদদের হটিয়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন।
সুজনের বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের বিরাজনীতিকরণ হয়েছে। বিরাজনীতিকরণ আমাদের রাজনীতিবিদরাই করেছেন। তারা রাজনীতিতে স্বার্থান্বেষীদের অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছেন।
‘একটা গোষ্ঠী যদি সংসদের অধিকাংশ আসনে জয়ী হন, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে কিন্তু তাদের স্বার্থে, তাদের কল্যাণে,’ যোগ করেন তিনি।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো: শাহনেওয়াজ বলেন, ব্যবসা করে রাজনীতিতে আসা অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু এরা যখন রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন, তখন রাজনীতি থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যস্ত হয়ে যান। ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করলে আসল রাজনীতি হবে না।
‘হয়তো দল গঠন করা যাবে, সরকার গঠন করা যাবে, দেশকে শাসন করা যাবে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনে শক্তিও প্রয়োগ করতে পারে, টাকার খেলা হবে।’
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ভোট হবে ৭ জানুয়ারি। রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর। মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চূড়ান্ত মনোনয়ন জমা দেয়ার জন্য এখনো কিছুদিন সময় আছে। এরি মধ্যে মনোনয়ন পরিবর্তন করার সুযোগ আছে বলেও মনে করছেন তারা।