অবাধ, মুক্ত নির্বাচনের আশা ফিকে হয়ে গেছে: সুলতানা কামাল

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় যে অবাধ, মুক্ত নির্বাচনের আশা নিয়ে মাঠে নামা হয়েছিলো তা ফিকে হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল।

সম্প্রতি স্বৈরাচার পতন দিবসে একাত্তর মঞ্চে অতিথি হিসেবে এসে এ কথা বলে সাবেক তত্ত্বাধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল।

একাত্তর টেলিভিশনের সম্পাদকীয় প্রধান সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

জুলহাজ মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামালের কাছে প্রশ্ন রাখেন, দেশের প্রধান দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন নির্বাচনী ব্যবস্থাকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পারেনি। স্বৈরাচার এরশাদ পতনের পর সংসদীয় ব্যবস্থায় দেশ ফিরে এসেছে ৩৩ বছর হলো। কোন কথাটি দুই দল রাখেনি।

সুলতানা কামাল বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা- এটা ছিলো এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি। এরশাদ পতনের পর আমরা অবাধ, মুক্ত নির্বাচন আন্দোলনও করেছি। নির্বাচন যাতে অবাধ ও মুক্ত হয় সেজন্য বিভিন্ন জায়গায় যেয়ে যেয়ে কাজও করেছি। যেই আশা ও আকাঙক্ষা নিয়ে এই আন্দোলন আমরা করেছিলাম সেটা অনেকখানি হারিয়ে গেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনে হয় এটা ফিরে আসার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে গেছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই সময় তিনজোটের যে রূপরেখা সেখানে সামনে একজন ‘শত্রু’ ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলো। এর ফলে যেটা হলো ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইটা পরস্পরের সঙ্গে হয়ে গেলো। একটা স্থায়ী গণতান্ত্রিক ধারা ও জীবনপদ্ধতি কায়েম করার কথা ছিলো। এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান যে গণ আন্দোলন, যেটা চলছিলো, সেটা প্রেক্ষিতে একটি সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠা করা এটা লক্ষ্য ছিলো।

সুলতানা কামাল বলেন, বিএনপি কখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টিতে অঙ্গীকার করেনি, করতে পারবে বলেও আশা করতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কিন্তু ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। জল ঘোলা করা হলো। আওয়ামী লীগ তখন ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে। তিনজোটের দুই জোট পরস্পরের স্বার্থবিরোধী জায়গায় চলে গেলো। ফলে তাদের একসঙ্গে করা রূপরেখার প্রতি আনুগত্য কমতে থাকলো। বিএনপি দেখলো রূপরেখার প্রতি আনুগত্য রাখলে তার চরিত্রগত অনেক কিছু ছাড়তে হবে। জামায়াতকে বারবার ছাড়ার কথা আসলো।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দেখলো বিএনপির সঙ্গে তারা যদি যায় তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন তারা করেছিলো সেটা তারা করতে পারবে না। বড় দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলো। দুঃখের বিষয় হলো সেই দ্বন্দ্বটা যেখানে দাঁড়ালো সেটা যতখানি না নৈতিক তারচেয়ে বেশি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।

বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোর তিনটি জোটের আন্দোলন এবং গণ অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর রাতে এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। পরদিন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ক্ষমতা গ্রহণ করে।

অবসান ঘটে এরশাদের নয় বছরের স্বৈরশাসনের। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবছর এ দিনটিকে পালন করে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রার দিন হিসেবে।

দিবসটি উপলক্ষে একাত্তর টেলিভিশনের নিয়মিত আয়োজন একাত্তর জার্নালে আসেন সুলতানা কামাল।

সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজ বলেন, আমরা দেখলাম, বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করলো। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানালো। আওয়ামী লীগ এরশাদকে নিয়ে মহাজোট করলো। যাদেরকে নিয়ে জোট না করার প্রতিশ্রুতি ছিলো।

সুলতানা কামালের প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, দুই দল তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে ক্রমাগত সরে আসার ফলে নির্বাচনী ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন কিনা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, এক কথায় বললে, হ্যাঁ। এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা আওয়ামী লীগের যে বক্তব্য পাই বা সময়ে সময়ে যে উত্তর পাই, তারা বলেন, যে অবস্থায় তারা ক্ষমতায় গিয়েছিলো, যখন ওই বিষয়গুলো থেকে বাংলাদেশের জনগণ বা সমাজব্যবস্থা সরে গেছে। যেটাতে কিছুটা সত্যতা আছে। কারণ ৭৫ থেকে পরবর্তীতে একটা সাম্প্রদায়িকীকরণ চলেছে। বঙ্গবন্ধুর অবদান মুছে ফেলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার হয়েছে। সমাজে যে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়েছে তাতে আওয়ামী লীগ তার আত্মবিশ্বাস রাখতে পারেনি। আত্মবিশ্বাস না থাকার কারণে বিভিন্ন জায়গায় তার বন্ধু খুঁজতে হয়েছে। আসমাদের সেই বন্ধু খোঁজা আমাদের মতে অত্যন্ত এলোমেলো হয়ে গেছে। নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। বিএনপিতো আগে থেকেই জোটে ছিলো। এরফলে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় নানা অপকৌশল ঢুকে গেলো।

দলগুলো জনস্বর্থ রক্ষা করছে?

সঞ্চালক জানতে জান, তাহলে নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে অপকৌশল ঢুকলো সেটা কীভাবে জনস্বার্থ রক্ষা করছে? দলগুলো জনগণের কাছে যাচ্ছে না। সুলতানা কামাল মনে করেন কিনা এখন জনগণ নয় বরং বেসামরিক-সামরিক আমলা এবং বিদেশি শক্তির যে প্রক্রিয়া দেখতে সেভাবে ক্ষমতা নির্ধারিত হয়?

জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, ভূরাজনীতির সম্পর্ক আছে। কিন্তু সেটা তখন কার্যকর হয় যখন দেখা যায় যারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন তারা জনসম্পৃক্ততা হারিয়ে ফেলেন। নির্বাচনে মূল নায়ক হিসেবে জনগণকে রাখতে হবে। রাজনীতিকরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চলতে না পারেন তখন বিদেশি শক্তি শক্তিশালী হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বিরাট শক্তি-মানুষ তার সঙ্গে ছিলো। আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি বঙ্গবন্ধু কন্যা কেন তার প্রায়োরিটি (জনসম্পৃক্ততা) হিসেবে নিলেন না? তিনি নেননি বলেই আমরা এত দুর্বিপাকে ঘুরপাক খাচ্ছি।

সঞ্চালক জানতে চান, যেখানে পুরো সমাজ দুটো দলে বিভক্ত সেখানে নির্বাচনী ব্যবস্থায় শক্তিশালী করতে ন্যূনতম একমত প্রতিষ্ঠা করা যাবে কিনা?

সুলতানা কামাল বলেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ বিরাট জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিলো। সেটা তারা কাজে লাগাতে পারলো না কেন? এটা তাদের বিরাট ব্যর্থতা। মানুষ তাদের প্রকৃত অর্থে ম্যান্ডেট দিয়েছিলো।

নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে নাগরিক সমাজ কেন দুই দলকে চাপ দেয় না। কেন তারা নিজেদের সুবিধামতো অবস্থান নেয়, জানতে চাইলে সুলতানা কামাল বলেন, এখানে নাগরিক সমাজ বিভক্ত। কারণ রাজনীতি ভীষণভাবে বিভক্তি তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের বাকস্বাধীনতা নেই। মানুষ তার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। মানুষ এখন হিসাব কষতে শিখে গেছে। রাষ্ট্র এখন জনবান্ধব নেই। ভেবেচিন্তে কথা বলতে হচ্ছে। স্বচ্ছভাবে কথা বলতে পারছি না।

‘বাক স্বাধীনতা বিপন্ন’

রাজনীতি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কেন আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কাছে গণতন্ত্র আশা করি?- এই প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, রাজনীতিই চূড়ান্ত নিয়ামক। এজন্যেই বারবার তাদের কাছে আমরা বলি, জনগণের কাছে ফিরে এসো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কাছে বারবার বলি। ঝুঁকি নিয়েই বলছি, বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা বিপন্ন। মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না। তার রাজনৈতিক নেতাকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের প্রতি আনুগত্যের ওপর। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্ম মিলিয়ে ফেলা হয়েছে। এখানে কোনো পথ দেখতে পাই না। সবসময় একটা বলি, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পবিত্র উত্তরাধিকার। সুউত্তরাধিকারী সেটাকে সমৃদ্ধ করে। যে উত্তরাধিকারী অযোগ্য তারা উত্তরাধিকার বেচে। বেচার ধর্মটা বন্ধ করতে হবে।