ফুটবল ‘ঈশ্বর’ ম্যারাডোনার মৃত্যুতে নতুন রহস্য

বিশ্বফুটবলের মহাকালের মহানায়ক ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার মৃত্যুর জন্য দায়ী চিকিৎসকদের কঠোর সমালোচনা করে তাদের ‘একদল অপেশাদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন আর্জেন্টিনার সরকারি কৌঁসুলিরা। ম্যারাডোনার মৃত্যুতে অবহেলার অভিযোগে অভিযুক্ত সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে মঙ্গলবার থেকে পুনরায় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, এক বছর আগে মামলার প্রধান বিচারপতির একটি তথ্যচিত্রে উপস্থিত হওয়াকে কেন্দ্র করে আগের বিচার প্রক্রিয়াটি বাতিল হয়ে গিয়েছিল।

বুয়েনস আইরেসের উপকণ্ঠে সান ইসিড্রোতে ফুটবলারের মৃত্যু সংক্রান্ত একটি মামলার প্রাথমিক শুনানির জন্য আদালতে উপস্থিত ম্যারাডোনার প্রাক্তন ডাক্তার লিওপোল্ডো লুকে ছবি: সংগৃহীত
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা ২০২০ সালের নভেম্বরে ৬০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হওয়ার সময়েই বাড়িতে থাকার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রসিকিউটর প্যাট্রিসিও ফেরারি আদালতের শুনানিতে বলেন, ম্যারাডোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত দলটি সব ধরণের বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করেছে এবং তাঁর শেষ সময়টি ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর।

ফেরারি আরও দাবি করেন, দিয়াগো ম্যারাডোনা তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর ১২ ঘণ্টা আগে থেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিলেন। যদি শেষ এক সপ্তাহের মধ্যে কেউ তাঁকে গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেয়ার চিন্তা করত, তবে হয়তো আজ ম্যারাডোনা বেঁচে থাকতেন।

আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনার কন্যা দালমা মারাদোনা (মাঝে) এবং তার প্রাক্তন সঙ্গী ভেরোনিকা ওজেদা (ডানে) শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন ছবি: সংগৃহীত
উত্তর বুয়েনস আইরেসের এক আদালত কক্ষে মঙ্গলবার উপস্থিত ছিলেন ম্যারাডোনার দুই কন্যা ডালমা ও জিয়ানিনা এবং তাঁর প্রাক্তন সঙ্গী ভেরোনিকা ওজেদা। গণমাধ্যমের কাছে ওজেদা বলেন, আমরা শুধু ডিয়েগোর জন্য বিচার চাই। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই এবং চাই ডিয়েগোর আত্মা যেন শান্তিতে থাকে।ৱ

আদালতের বাইরে তখন ম্যারাডোনার প্রায় ৫০ জন ভক্ত আর্জেন্টিনার পতাকা ও প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিচ্ছিল। তাঁদের প্রিয় ‘D10s’ (ঈশ্বরের বিকল্প নাম হিসেবে ব্যবহৃত) এর মৃত্যুর সঠিক বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

মামলায় অভিযুক্ত চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও নার্সদের বিরুদ্ধে ‘উদ্দেশ্যমূলক নরহত্যা’র অভিযোগ আনা হয়েছে। এর অর্থ হলো, তাঁরা জানতেন তাঁদের গৃহীত চিকিৎসা পদ্ধতি রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তবুও তাঁরা সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়িতে সুস্থ হওয়ার সিদ্ধান্তটিই ছিল প্রাণঘাতী। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের ৮ থেকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

সান ইসিড্রোতে আদালত ভবনের বাইরে ম্যারাডোনার সমর্থকরা জড়ো হয় ছবি: সংগৃহীত
ম্যারাডোনার পরিবারের আইনজীবী ফার্নান্দো বারল্যান্ডো আদালত কক্ষে একটি স্টেথোস্কোপ প্রদর্শন করে বলেন, মৃত্যুর আগের দুই সপ্তাহে চিকিৎসকরা এই যন্ত্রটি একবারও ম্যারাডোনার বুকে ঠেকিয়ে দেখেননি। তবে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ম্যারাডোনার মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার চূড়ান্ত পরিণতি।

অন্তত ১২০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর আগামী জুলাই মাস নাগাদ এই মামলার রায় আসতে পারে। কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন ম্যারাডোনার মৃত্যু শুধু একটি নক্ষত্রের পতন ছিল না, বরং এটি ছিল ফুটবল বিশ্বের জন্য এক বিশাল শোকের মুহূর্ত এবং মহাকালের পতন। এখন দেখার বিষয়, আইনি লড়াইয়ের শেষে ম্যারাডোনার পরিবার ও ভক্তরা কাঙ্ক্ষিত বিচার পান কি না।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা