মেসি মানেই রেকর্ডের নতুন সংজ্ঞা। সময়ের এক অনন্য মাপকাঠি হিসেবে লিওনেল মেসি আজ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যেখানে অতীতের সব ইতিহাস ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার আর মাত্র ৪২ দিন বাকি, আর তখনই কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে আলজেরিয়ার বিপক্ষে অধিনায়ক হিসেবে টানা ১৮তম বিশ্বকাপ ম্যাচে মাঠে নামবেন তিনি। এর মাধ্যমে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে পা রেখে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছেন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।
২০১০ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার প্রশিক্ষণে জাভিয়ের মাশ্চেরানোর অধিনায়কত্বে শেষবার মেসিকে ছাড়া অন্য কোনো অধিনায়কের অধীনে বিশ্বকাপ খেলেছিল আর্জেন্টিনা। ২০১১ সালে আলেহান্দ্রো সাবেলার সময় মাশ্চেরানোর কাছ থেকে নেতৃত্বের আর্মব্যান্ড বুঝে নেন মেসি। শুরুর দিকে তার স্বভাবজাত লাজুকতা নিয়ে সংশয় থাকলেও, সময় গড়ানোর সাথে সাথে তিনি নিজেকে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রশ্নহীন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মেসির মূল শক্তি তার দায়বদ্ধতা, যা কখনোই আলোচনার বিষয় ছিল না।
অধিনায়কদের ভিড়ে একজনই প্রধান: আর্জেন্টিনা দলের বর্তমান চিত্রটি বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। এই দলে রয়েছেন অসংখ্য 'অধিনায়ক'। ক্লাবের হয়ে অনেকেই অধিনায়কত্ব করেন—বেনফিকার অধিনায়ক নিকোলাস ওতামেন্দি, টটেনহ্যামের ত্রাস ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, ইন্টার মিলানের 'ইল ক্যাপিটানো' লাউতারো মার্টিনেজ কিম্বা চেলসির এনজো ফার্নান্দেজ। এমনকি গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ কিংবা রক্ষণভাগের লিসান্দ্রো মার্টিনেজরাও নিজ নিজ জায়গায় একেকজন নেতা। তা সত্ত্বেও, এই একঝাঁক নেতার কেউই মেসির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না।
ইকুয়েডরের বর্তমান কোচ সেবাস্টিয়ান বেকাসেসের মতে, মেসি গত ২০ বছর ধরে সবার উপরে থেকেও যেভাবে নম্রতার সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা বিস্ময়কর। তার এই প্রশ্নহীন নেতৃত্ব কোচের কাজ অনেক সহজ করে দেয়, কারণ দলে শৃঙ্খলার কোনো ঘাটতি থাকে না।
উত্তরাধিকার ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ: মেসি সম্ভবত তার শেষ বিশ্বকাপটি খেলতে যাচ্ছেন। যারা মেসির পোস্টার দেয়ালে টাঙিয়ে বড় হয়েছে, সেই প্রজন্মের কাছে তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় নন, বরং একটি আদর্শ। তবে প্রশ্ন জাগে—মেসি পরবর্তী যুগে কে হবেন আলবিসেলেস্তেদের নেতা? ওতামেন্দি, দি পল কিম্বা কুটি রোমেরোদের আগ্রাসী মেজাজ দলের জন্য ইতিবাচক হলেও, ফিফা এবং ভিএআর-এর যুগে এই মেজাজ বিপদের কারণ হতে পারে। কোচ স্কালোনির সহকারী রবার্তো আয়ালাও সেই সতর্কবার্তা দিয়েছেন, অতিরিক্ত মেজাজ দেখিয়ে কার্ড পেলে তা দলের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
ইতিহাসের পাতায় মেসির স্বাক্ষর: আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে ১৯৩০ সালের 'নলো' ম্যানুয়েল ফেরেরা থেকে শুরু করে ড্যানিয়েল প্যাসারেলা কিংবা দিয়েগো ম্যারাডোনা, অধিনায়করা বরাবরই ছিলেন লড়াকু এবং নির্ভীক। মেসি সেই ধারাকে শুধু বজায় রাখেননি, বরং এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। পরপর চারটি বিশ্বকাপে অধিনায়কত্ব করার মাধ্যমে তিনি দিয়েগো ম্যারাডোনার রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে চলেছেন।
মেসির এই অদম্য ক্ষুধা আর জাতীয় দলের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পুরো দলকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে। তার অনুসারীরা জানে, যখন তাদের নেতা সামনে থেকে লড়াইয়ের ডাক দেন, তখন পিছু হটার কোনো অবকাশ নেই। আগামী বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার এই 'ক্ষুধার্ত নেকড়েরা' পুনরায় বিশ্বজয়ের লক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত।