আগামী ১১ জুন, বৃহস্পতিবার মেক্সিকো সিটিতে পর্দা উঠছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহাযজ্ঞের। ফিফা বিশ্বকাপের কিক-অফের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এই শেষ মুহূর্তে আয়োজক দেশগুলোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
তবে, এবার ইনফান্তিনো কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচ বা ভেন্যুর গুণগান গাইছেন না; বরং তিনি বিশ্ববাসীকে বুঁদ করতে চাইছেন এক মাসব্যাপী এক অবিস্মরণীয় ‘ফ্যান এক্সপেরিয়েন্স’ বা সমর্থক-অভিজ্ঞতায়। কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া এই আসরে ফুটবল পিচের লড়াইকে ছাড়িয়ে মাঠের বাইরের উৎসবকে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে হাজির করছে ফিফা।
ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি একেবারে শেষ পর্যায়ে এবং তা দারুণ গতিতে এগোচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের এই মেগা টুর্নামেন্ট সফল করতে ৩টি আয়োজক দেশ এবং ১৬টি আয়োজক শহর দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।
স্টেডিয়ামের পিচে নতুন ঘাস লাগানো থেকে শুরু করে টিম বেস ক্যাম্পগুলোর শেষ মুহূর্তের কাজ এখন তুঙ্গে। তবে ফিফা এবার কেবল স্টেডিয়ামের গণ্ডিতে আটকে থাকতে রাজি নয়।
ইনফান্তিনো স্পষ্ট করে বলেছেন, স্থানীয় শহরের নেতারা এমনভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন যাতে একজন দর্শক শুধু ম্যাচের টিকিটই পাবেন না, পাবেন জীবনের অন্যতম সেরা একটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। প্রতিটি শহর যেন এই ফুটবল জোয়ারে দৃশ্যমানভাবে মেতে ওঠে, সেটাই এখন মূল লক্ষ্য।
ইনফান্তিনোর দেওয়া তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল ফাইনালের সপ্তাহের পরিকল্পনা। আগামী ১৬ থেকে ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের জাভিটস সেন্টারে অনুষ্ঠিতব্য 'ফ্যানাটিকস ফেস্ট'-এ বড় আকারে উপস্থিতি জানান দেবে ফিফা। এমনকি ফাইনাল ম্যাচের আগের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনটিও ঐতিহ্যবাহী কোনো ভেন্যুর বদলে এই উৎসবস্থলেই আয়োজন করা হবে।
একইভাবে নিউইয়র্কের আইকনিক টাইমস স্কয়ারকে রূপ দেওয়া হচ্ছে এক বিশাল পাবলিক গ্যালারিতে। সেখানে ফাইনাল এবং ব্রোঞ্জ মেডেল (তৃতীয় স্থান নির্ধারণী) ম্যাচের জন্য লাইভ মিউজিক ও ওয়াচ পার্টির আয়োজন করা হচ্ছে। অর্থাৎ, মাঠের ফুটবলকে ফিফা সরাসরি টেনে আনছে শহরের নাগরিক ও সাধারণ মানুষের উৎসবের অন্দরে।
আসন্ন বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচকে স্রেফ একটি খেলা নয়, বরং একটি বিশ্বমানের বিনোদন প্যাকেজ বানাতে কোমর বেঁধে নেমেছে ফিফা। ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক-নিউ জার্সিতে হতে যাওয়া ফাইনালের প্রথমার্ধ শেষে ইতিহাসের প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হচ্ছে এক জমকালো 'হাফটাইম শো'।
এই মেগা শো প্রযোজনা করছে বিশ্বখ্যাত সংস্থা 'গ্লোবাল সিটিজেন', আর এর প্রধান কিউরেটরের দায়িত্বে থাকছেন জনপ্রিয় ব্যান্ড কোল্ডপ্লে’র ক্রিস মার্টিন। সেলিব্রেটি, সংগীত আর ফুটবলের এই অভূতপূর্ব ককটেল ফাইনাল উইকেন্ডের বাণিজ্যিক ও আবেগীয় আবেদনকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে।
তবে ইনফান্তিনো যে রঙিন ও চোখধাঁধানো স্বপ্নের কথা বলছেন, তা বাস্তবে রূপ দেওয়া কিন্তু মুখের কথা নয়। ১০৪টি ম্যাচে স্টেডিয়ামগুলোতে হাজির হবেন লাখ লাখ ফুটবল অনুরাগী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াত, ফ্যান জোন ব্যবস্থাপনা এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখা আয়োজকদের জন্য এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। ছোট একটি ভুল বা লজিস্টিকস বিপর্যয়ও পুরো আয়োজনকে ম্লান করে দিতে পারে।
সে কারণেই ফিফা প্রধানের বক্তব্যে ফাঁকা আওয়াজের চেয়ে প্রস্তুতির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। আগামী ১১ জুন মেক্সিকো সিটির উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়েই শুরু হবে এই অগ্নিপরীক্ষা। দল ও দর্শক সামলানোর এই তুমুল চাপ ৩টি দেশ কতটা সামলাতে পারে, তা প্রথম সপ্তাহেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। কেবল একটি দারুণ ফাইনাল দিয়ে শুরুর দিকের অব্যবস্থাপনা ঢাকা দেওয়া যাবে না, তাই সব শহরেই সমান সক্রিয়তার দাবি রাখছে ফিফা।
ফুটবল ম্যাচ তো বটেই, তার বাইরে শহরজুড়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, মিউজিক কনসার্ট আর বিনোদনের এক মহাসমুদ্র তৈরি করতে চাইছে ফিফা। যদি তাদের এই ছক সফল হয়, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ আগের সব আসরকে টোন ও জাঁকজমকে বহুদূর ছাড়িয়ে যাবে।
আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে এই বিশালাকার আয়োজনেই ছোট ছোট ভুলগুলো পাহাড়সম হয়ে দেখাবে। মাঠের মহারণ শুরুর কাউন্টডাউন তো শুরু হয়েই গেছে, এখন দেখার বিষয় ইনফান্তিনোর এই বিলাসবহুল স্বপ্নকে আয়োজক দেশগুলো কতখানি বাস্তবে রূপ দিতে পারে!