বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই কোটি কোটি ভক্তের উন্মাদনা, গ্যালারি ভরা দর্শকের চিৎকার আর বিশ্ববাসীর নজর। কিন্তু আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ গ্যালারির ভিড় কিংবা টিম হোটেল নয়; বরং স্টেডিয়ামের মাথার ওপর খোলা আকাশ!
স্টেডিয়ামের আকাশসীমায় যে কোনো ধরনের বিপজ্জনক ও অননুমোদিত ড্রোনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং সেগুলোকে অকেজো করতে এবার বিশেষ কমান্ডো বা বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালীন যেকোনো বৈরী বা হামলাকারী ড্রোন শনাক্ত এবং ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করতে প্রায় ৬০ জন বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত রাজ্য ও স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাকে মাঠে নামাচ্ছে এফবিআই।
ইতিমধ্যেই আলাবামার হান্টসভিলে এফবিআই’র বিশেষ ‘ন্যাশনাল কাউন্টার-ইউএএস ট্রেইনিং সেন্টারে এই বাহিনীর দুই সপ্তাহের নিবিড় প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং মিয়ামি-ডেড শেরিফ অফিসের চৌকস পুলিশ কর্মকর্তারা এফবিআই-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই অত্যাধুনিক ড্রোন-রোধী সরঞ্জাম পরিচালনার পাঠ নিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি আয়োজক শহরের মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি এবং নিউইয়র্কের মতো হাই-প্রোফাইল ভেন্যুগুলোর ড্রোন দমন অভিযান এফবিআই নিজে তদারকি করবে। বাকি আটটি শহরের আকাশ সুরক্ষার দায়িত্বে থাকবে মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি।
এই বিশেষ অপারেশনের মূল কৌশলটি সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক। স্টেডিয়ামের নিষিদ্ধ আকাশসীমায় কোনো ড্রোন ঢুকলেই রাডার, বিশেষ ক্যামেরা এবং রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি সেন্সরের মাধ্যমে সেটিকে ট্র্যাক করা হবে। এরপর কোনো রকম হইচই বা আতঙ্ক না ছড়িয়ে দূর থেকেই বেতার তরঙ্গের সাহায্যে ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ হ্যাক বা জ্যাম করে দেওয়া হবে।
এই কাউন্টার-ড্রোন প্রোগ্রামের প্রধান এফবিআই এজেন্ট মাইকেল টর্ফি একটি মহড়ার পর সাংবাদিকদের বলেন, আমরা চাই পুরো বিষয়টা যেন অত্যন্ত ‘বোরিং’ বা নীরস দেখায়। কোনো রকম আতঙ্ক ছাড়াই যেন ড্রোনগুলো আকাশেই মুখ থুবড়ে পড়ে।
অর্থাৎ, মাঠে খেলা চলাকালীন নিরাপত্তা বাহিনী নিঃশব্দে ড্রোন নামিয়ে দেবে, যা সাধারণ দর্শকরা টেরও পাবেন না। এফবিআই’র অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ডেভিন কোয়ালস্কি বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, বিশ্বকাপের ম্যাচ থেকে শুরু করে আমেরিকার ২৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান, যে কোনো বড় গণজমায়েতই এখন ড্রোনের ঝুঁকিতে রয়েছে। জনগণ আশা করে যে এই আকাশ সুরক্ষিত থাকবে এবং তাদের সেই নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন খেলাধুলার মাঝে অননুমোদিত ড্রোন ঢুকে পড়ার ঘটনা অনেক বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ার লেভিস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘সুপার বোল ৬০’-এর সময় স্টেডিয়ামের ৩০ মাইলের মধ্যে ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। তখনো ড্রোন শনাক্তে এফবিআই মাঠে ছিল এবং আইন অমান্যকারীদের জরিমানা, ড্রোন বাজেয়াপ্তসহ ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
তবে বিশ্বকাপের পরিধি ও গুরুত্ব সুপার বোলের চেয়ে বহুগুণ বেশি। ১১টি মার্কিন শহর জুড়ে শুধু ম্যাচই নয়, লাখ লাখ মানুষের ফ্যান ফেস্টিভ্যাল ও পাবলিক ভিউইং এরিয়া থাকবে, যা নিরাপত্তা মানচিত্রকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাত। এই যুদ্ধগুলো বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে যে কীভাবে খুব সস্তা ও সাধারণ ড্রোনকে সামান্য মডিফাই করে নজরদারি, নাশকতা বা বিস্ফোরক হামলায় ব্যবহার করা যায়। রণক্ষেত্রের সেই বিপজ্জনক শিক্ষাই এখন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে বাধ্য করেছে।
খেলা দেখতে আসা সাধারণ দর্শকদের জন্য স্টেডিয়ামের প্রবেশদ্বারে হয়তো বাড়তি কোনো কড়াকড়ি থাকবে না, তবে বার্তাটি একদম পরিষ্কার, বিশ্বকাপে নিরাপত্তা বাহিনী কেবল গ্যালারির ভিড়ের দিকেই চোখ রাখবে না, তাদের চোখ থাকবে আকাশের ঈগলগুলোর ওপরেও!