পিএসজির রুদ্রমূর্তি আর মাঠ কাঁপানো আক্রমণভাগের সামনে শনিবার বাংলাদেশ সময় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে আর্সেনালের ভাগ্য নির্ধারণ হতে যাচ্ছে এক চরম অগ্নিপরীক্ষায়। দীর্ঘ ২২ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা খরা কাটিয়ে মিকেল আর্তেতার দল এখন সম্পূর্ণ চাপমুক্ত। ঘরোয়া লিগ জয়ের পর এবার তাদের পাখির চোখ ইউরোপ সেরার ‘ঝকঝকে ডাবল’ অর্জনের দিকে, যা প্রমাণ করবে যে গানার্সরা এখন সত্যিই ইউরোপের এলিট ক্লাবের চূড়ায় বসেছে।
বুদাপেস্টে লুইস এনরিকের পিএসজির ক্ষিপ্রতা, ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা আর কঠোর পরিশ্রমের মিশেলের বিরুদ্ধে লড়াইটা মোটেও সহজ হবে না। গত বছর ফাইনালে ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেয়ার সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি এখনও সবার টাটকা। তবে পিএসজির সেই জয়রথ থামানোর জন্য আর্সেনাল বস মিকেল আর্তেতা তাঁর দলের রক্ষণে ও মাঝমাঠে এমন এক ‘লৌহকঠিন মেরুদণ্ড’ তৈরি করেছেন, যা প্যারিসের আক্রমণকে বোতলবন্দী করার জন্য এক পারফেক্ট টোটকা।
এই মেরুদণ্ডের একদম গোড়ায় আছেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক ডেভিড রায়া। ফাইনালে ওঠার পথে আর্সেনালের টানা ১৪ ম্যাচের অপরাজিত থাকার অভিযানে তিনি ৯টি ম্যাচে কোনো গোলই খেতে দেননি। তিন বছর আগে রায়াকে যখন দলে আনা হয়, তখন অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন; কিন্তু আর্তেতা আজ বুক ফুলিয়ে বলতেই পারেন, তাঁর সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তই আজ আর্সেনালকে ২২ বছর পর লিগ শিরোপা এবং দীর্ঘ ২০ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে তুলেছে।
আর সেন্ট্রাল ডিফেন্সে ফরাসি তারকা উইলিয়াম সালিবার গতি ও নিখুঁত বল পাসিংয়ের সাথে ব্রাজিলিয়ান গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের আগ্রাসী মনোভাবের যে যুগলবন্দী, তা এককথায় অনবদ্য। কর্নার থেকে কর্নার থেকে বাতাসে ভেসে এসে গুরুত্বপূর্ণ গোল করায় ওস্তাদ ২৮ বছর বয়সী গ্যাব্রিয়েল।
একসময় ফান্ড জোগাতে তাঁকে বিক্রি করে দেওয়ার গুঞ্জন উঠলেও আজ তা ভাবাই পাপ! সেমিফাইনালে আতলেতিকো মাদ্রিদের জুলিয়ানো সিমিওনের নিশ্চিত গোলের মুখে গ্যাব্রিয়েলের সেই শেষ মুহূর্তের মহাকাব্যিক ট্যাকলই আর্সেনালকে ফাইনালে তুলেছে। আর্তেতাও তাই অকপটে স্বীকার করেছেন, বড় ম্যাচে কাউকে না কাউকে জাদু দেখাতে হয়, আর গ্যাব্রিয়েল সেটাই করেছে।
পিএসজিকে মাঝমাঠেই থামিয়ে দেয়ার মূল দায়িত্ব থাকবে ক্লাবের রেকর্ড ১০৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সাইনিং ডেক্লান রাইসের ওপর। অক্লান্ত পরিশ্রম আর মাঠজুড়ে অবিরাম দৌড়ানোর ক্ষমতার কারণে তাঁকে দলে ডাকা হয় ‘ঘোড়া’ নামে। এই ২৭ বছর বয়সী মিডফিল্ডারের নিখুঁত সেট-পিস আর ক্লান্তিহীন ট্যাকলই আর্সেনালের খেলার মূল চালিকাশক্তি।
পুরো মৌসুমে গোলরক্ষক রায়ার পর তিনিই সবচেয়ে বেশি (৩,০০০ মিনিটের ওপর) মাঠে ছিলেন। ফাইনাল নিয়ে বেশ চনমনে রাইস বিবিসিকে বলেন, এটা ফাইনাল, এখানে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। তবে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত এবং আমরা ‘ডাবল’ জিততে চাই।"
আর্সেনালের এই মেরুদণ্ডের একদম মাথায় আক্রমণভাগে থাকছেন নতুন সাইনিং ভিক্টর গিওকেরেস। চ্যাম্পিয়নস লিগে এই সুইডিশ স্ট্রাইকারের ৫টি গোল পিএসজি’র খিচা কভারতসখেলিয়ার ১০ গোলের তুলনায় কিছুটা মলিন শোনালেও, প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের ওপর শুরুতে চড়াও হওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই আর্তেতার প্রধান অস্ত্র। আর এই কারণেই পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে আর্সেনালকে বল ছাড়া বিশ্বের সেরা দল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
আর্সেনালের কিংবদন্তি সাবেক কোচ আর্সেন ভেঙ্গার, যাঁর ‘ইনভিন্সিবল’ বা অপরাজিত দলটি যেমন শৈল্পিক ফুটবল খেলত, তেমনি ডিফেন্সে ছিল ইস্পাতকঠিন, তিনিও এখন আর্তেতার এই দলের ওপর দারুণ বাজি ধরছেন। উয়েফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভেঙ্গার বলেন, এই আর্সেনাল দলটির প্রধান শক্তি হলো গোল না খাওয়ার অদম্য ক্ষমতা, আর ফাইনাল ম্যাচে এই ক্লিন শিট ধরে রাখার ক্ষমতাই ট্রফি নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। এখন দেখার বিষয়, আর্তেতার এই ‘লৌহকঠিন মেরুদণ্ড’ পিএসজি’র তারকাবহুল আক্রমণকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে কি না!