বুকভরা বেদনা নিয়ে শত্রুর ডেরায় খেলতে নামছে ইরান

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন বৈরি ও নজিরবিহীন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি। স্বাগতিক একটি দেশের সাথেই নিজের দেশ লড়ছে এক রক্তক্ষয়ী ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে, ঠিক এমন এক চরম মানসিক চাপ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বুক পকেটে নিয়ে ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে ইরান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র- ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে ঠিকই; কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখনো বারুদের গন্ধ। যেকোনো মুহূর্তে আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কার মাঝেই ইরানি ফুটবলারদের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইরানের সবকটি ম্যাচই হবে মার্কিন মুলুকে।

যুদ্ধ ও চরম গোলযোগের কারণে ইরানি দলটির গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় কেটেছে তুরস্কে। সেখান সমুদ্র উপকূলবর্তী রিসোর্ট আনতালিয়াতে মূলত তাঁরা অনুশীলন চালিয়েছেন এবং দলের বেশ কয়েকজন সদস্য মার্কিন ভিসার আবেদনের জন্য রাজধানী আঙ্কারার আমেরিকান দূতাবাসেও ছুটে গিয়েছিলেন। টুর্নামেন্টে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরণের সংশয় ছিল। মার্কিন ভিসা পাওয়ার বিষয়টি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২৯ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ইরানি মিডফিল্ডার সাইদ এজাতোলাহি ছবি: সংগৃহীত
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও খেলোয়াড়দের মানসিক দ্বন্দ্ব:  
বুধবার অনুশীলনের ফাঁকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নিউজ এজেন্সিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ২৯ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ইরানি মিডফিল্ডার সাইদ এজাতোলাহি নিজের মানসিক কষ্টের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। ২০১৮ ও ২০২২ সালের পর এটি তাঁর তৃতীয় বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সত্যি বলতে, পরিস্থিতি আমাদের জন্য মোটেও সহজ নয়। আমার বা কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের জন্য হয়তো মাঠের বাইরের এই চাপ সামলানো কিছুটা সহজ। কিন্তু দিনশেষে এটি সবার জন্যই ভীষণ কঠিন। কারণ আমরা প্রতিনিয়ত দেশের যুদ্ধ ও রাজনৈতিক খবরগুলো রাখছি, যা স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড় ও দেশের মানুষের মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলছে।

অবশ্য আঙ্কারার মেক্সিকান দূতাবাস থেকে ভিসা পাওয়ার পর এই সপ্তাহান্তেই দলটি মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে রওনা হবে। বৃহস্পতিবার ইরান ফুটবল দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলের সব সদস্যের মেক্সিকো প্রবেশের অনুমতি বা পারমিট প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। ভিসার জটিলতার কারণেই ইরানের বিশ্বকাপ ট্রেনিং বেস বা মূল অনুশীলন শিবিরটি আমেরিকার অ্যারিজোনার টুকসন থেকে সরিয়ে সরাসরি মেক্সিকোর টিজুয়ানাতে (যা ক্যালিফোর্নিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন) নেওয়া হয়েছে।

২৪ বছর বয়সী তরুণ ফুটবলার মোহাম্মদ ঘোরবানি ছবি: সংহীত
লস অ্যাঞ্জেলেসের চাপ ও প্রথম বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ:
গ্রুপ পর্বে ইরানের প্রথম দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছাকাছি এলাকায়, যেখানে একটি বিশাল সংখ্যক ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। তবে এই প্রবাসীদের অনেকেই বর্তমান ইরান সরকারের কট্টর বিরোধী। এই বিষয়ে এজাতোলাহি বলেন, "আমরা নিশ্চিতভাবেই স্টেডিয়ামে প্রচুর দর্শক পাওয়ার আশা করছি। তবে এটি আমাদের ওপর এক বিরাট মানসিক চাপও তৈরি করবে, কারণ আমাদের নিয়ে প্রত্যাশা থাকবে আকাশচুম্বী। আমি শুধু আশা করি আমরা তাঁদের গর্বিত করতে পারব এবং বিশ্বকে দেখাতে পারব যে ইরানিরা পৃথিবীর যেকোনো কঠিন কাজের জন্য সবসময় প্রস্তুত।

অন্যদিকে, ২৪ বছর বয়সী তরুণ ফুটবলার মোহাম্মদ ঘোরবানি তাঁর জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। আবুধাবি-ভিত্তিক এই খেলোয়াড় ফার্সি ভাষায় বলেন, এটা সত্য যে আমরা এখন এক বিশেষ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি। কিন্তু আমরা ফুটবলার এবং আমাদের মূল কাজ হলো মাঠে খেলা, অনুশীলন করা এবং সামনের লড়াইয়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। অন্য দিকে, আমরা এটাও জানি যে যুদ্ধের কারণে আমাদের দেশের মানুষ চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা শুধু তাঁদের মুখে একটুখানি হাসি ফোটাতে এবং সেরা ফলাফল এনে দিতেই ওখানে যাচ্ছি।

যুদ্ধ ও চরম গোলযোগের কারণে ইরানি দলটির গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় কেটেছে তুরস্কে ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধের ক্ষত ও গ্রুপ পর্বের কঠিন সমীকরণ:
যুদ্ধের শুরুর দিকেই মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এর জবাবে ইরানও ইসরাইল, মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা মিসাইল হামলা চালায়। একই সাথে তারা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের চাবিকাঠি ‘হরমুজ প্রণালী’ কঠোরভাবে অবরুদ্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দেয়। এই নামমাত্র যুদ্ধবিরতির মধ্যেও দুই দেশ এখনও কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি, যার ফলে মাঝেমধ্যেই ওই অঞ্চলে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্বকাপে ইরান রয়েছে গ্রুপ ‘জি’-তে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং মিশর। নিয়মানুযায়ী আগামী ১৪ জুনের আগে ইরানি দলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে না। ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের র্যামস স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ইরান। এরপর ২১ জুন বেলজিয়ামের মুখোমুখি হতে তারা আবারও একই মাঠে ফিরবে এবং ২৬ জুন সিয়াটেলে মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ করবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের (স্পেন, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, কাতার এবং বর্তমানে দুবাই) ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এজাতোলাহি বলেন, আমাদের এখন মনকে শান্ত ও সতেজ রাখতে হবে। কারণ আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ও দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের জন্য লড়াই করা, বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং আমরা কতটা সেরা তা প্রমাণ করা। তরুণ ঘোরবানিও তাঁর সুর মিলিয়ে বলেন, এই মুহূর্তে আমি এটুকুই বার্তা দিতে পারি, ইরানি দল বিশ্বের সামনে একতার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করছে। আমরা দেখাতে চাই যে আমরা এক পতাকার নিচে একটি একক দল, যারা পুরো দেশকে আনন্দ দিতে পারে এবং বিশ্বমঞ্চে ইরানি খেলোয়াড় ও সাধারণ মানুষের অদম্য শক্তির পরিচয় তুলে ধরতে পারে।