তিন দেশের যৌথ আয়োজন আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দলগুলোর অংশগ্রহণ, এমনিতেই ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জমকালো আসর হতে যাচ্ছে। ৩৯ দিনের এই ফুটবল মহাযজ্ঞকে কেবল মাঠের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ রাখছে না ফিফা; বরং একে রূপ দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তির এক এলাহী কারখানায়। গ্যালারিতে থাকা দর্শক কিংবা টেলিভিশন পর্দার কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে এক অনন্য রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দিতে এবং রেফারিদের ভুলভ্রান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এবার মাঠে নামছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর রোবটিক্স।
আসন্ন বিশ্বকাপে প্রযুক্তির যে পাঁচটি বড় চমক ফুটবলপ্রেমীদের চোখ কপালে তুলতে যাচ্ছে, তা নিয়ে আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনটি নিচে তুলে ধরা হলো:
বলের পেটে সেন্সর চিপ!
এবারের বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রিওন্ডা’, যা একটি স্প্যানিশ শব্দ এবং এর অর্থ ‘তিনটি তরঙ্গ’। বিখ্যাত ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের তৈরি এই বলের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি।
বলটির ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে বসানো হয়েছে একটি খুদে ‘আইএমইউ’ সেন্সর চিপ। এই জাদুকরী চিপটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার ডেটা বা তথ্য ধারণ করতে পারে, যা বলের গতি, ত্বরণ এবং ত্রিমাত্রিক স্পেসের নিখুঁত নড়াচড়া ট্র্যাক করবে। মাঠের রেফারি বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি সিস্টেমে রিয়েল-টাইমে এই ডেটা পৌঁছে যাবে। ফলে অফসাইড বা বল গোললাইন পার হয়েছে কি না, এমন জটিল সিদ্ধান্তগুলো চোখের পলকে কোনো ভুল ছাড়াই দিয়ে দিতে পারবেন ম্যাচ অফিশিয়ালরা।
এআই-চালিত থ্রিডি প্লেয়ার অবতার ও বডি ক্যাম
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পার্সোনাল কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘লেনোভো’ এবং ফিফার যৌথ অংশীদারিত্বে এবার ফুটবলারদের নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন থ্রিডি অবতার। বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীরকে মাত্র এক সেকেন্ডের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্যান করে একটি নিখুঁত থ্রিডি মডেল তৈরি করা হবে। এই মডেলের সাহায্যে অত্যন্ত দ্রুতগতির বা জটলার ভেতরের মুভমেন্টও নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করা যাবে।
শুধু তাই নয়, ভিএআর যখন কোনো অফসাইডের সিদ্ধান্ত নেবে, তখন এই থ্রিডি মডেলগুলোর মাধ্যমে স্টেডিয়ামের বড় স্ক্রিনে এবং টেলিভিশনে দর্শকদের সামনে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় অ্যানিমেশন আকারে তা ফুটিয়ে তোলা হবে। এর পাশাপাশি, মাঠের উত্তাপ সরাসরি ফিল করতে এবার ১০৪টি ম্যাচের প্রতিটিতেই রেফারিদের শরীরে লাগানো থাকবে ‘বডি ক্যামেরা’। ফলে রেফারি মাঠের ভেতর থেকে ঠিক যা দেখছেন, দর্শকরাও ঘরে বসে একদম সেই ভিউ বা কোণ থেকেই খেলা উপভোগ করতে পারবেন।
দুর্ধর্ষ রোবট কুকুর, স্টেডিয়ামের গোয়েন্দা
বিশ্বকাপের উত্তেজনায় মাঠের বাইরে বা গ্যালারিতে যেকোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা বা অপরাধ রুখতে মেক্সিকান পুলিশ এবার এক অভিনব হাতিয়ার নামাচ্ছে। মেক্সিকোর মনটেরি মেট্রো এলাকার গুয়াদালুপে সিটি কাউন্সিল প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলার খরচ করে কিনেছে বিশেষ ‘রোবট কুকুর’।
এই চারপেয়ে অ্যানিমলয়েড রোবটগুলো যে কোনো বিপজ্জনক বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার এলাকায় মানুষের আগেই প্রবেশ করতে পারবে এবং সেখান থেকে লাইভ ভিডিও সরাসরি কন্ট্রোল রুমে সিকিউরিটি ফোর্সের কাছে পাঠাবে। গুয়াদালুপের মেয়র হেক্টর গার্সিয়া জানান, যে কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতিতে পুলিশ অফিসারদের শারীরিক নিরাপত্তা দিতে এবং প্রাথমিক হস্তক্ষেপ করতেই এই রোবট কুকুরদের মোতায়েন করা হবে।
অফসাইডের জট খুলতে ‘সুপার ফাস্ট’ টেকনোলজি
লাইন্সম্যান কখন অফসাইডের পতাকা তুলবেন, সেই বিরক্তিকর অপেক্ষার দিন এবার শেষ হতে চলেছে। ফিফা এবার নিয়ে এসেছে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির এক উন্নত সংস্করণ। আগে এই প্রযুক্তি শুধু তখনই রেফারিকে অ্যালার্ট করত যখন কোনো খেলোয়াড় ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে থাকতেন।
কিন্তু এবার এর সেন্সর এতটাই ধারালো করা হয়েছে যে, কোনো খেলোয়াড় মাত্র ১০ সেন্টিমিটার অফসাইডে থাকলেও রেফারিদের হেডফোনে সরাসরি রিয়েল-টাইম অডিও অ্যালার্ট চলে যাবে।
তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে; যেমন খেলোয়াড়রা যদি মাটিতে পড়ে থাকেন বা শরীরগুলো বড্ড বেশি গাদাগাদি করে থাকে, তবে এটি স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তাছাড়া কোনো খেলোয়াড় উদ্দেশ্যমূলকভাবে খেলায় বাধা দিচ্ছেন কি না, তা বিচার করার ক্ষমতা এই এআই’র নেই, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রেফারিকেই নিতে হবে। তা সত্ত্বেও ফিফা মনে করে, এই প্রযুক্তির কারণে অযথা খেলা টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং খেলোয়াড়দের ইনজুরির ঝুঁকিও অনেক কমে আসবে।
বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’
খেলোয়াড়দের সুস্থতা এবং শারীরিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ফিফা এবার বিশ্বকাপে প্রতিটি অর্ধে বাধ্যতামূলক ৩ মিনিটের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা জলপানের বিরতি চালু করছে। মাঠের আবহাওয়া কেমন, স্টেডিয়ামের ছাদ খোলা নাকি বন্ধ, কিংবা তাপমাত্রা কত, তার ওপর এই ব্রেক নির্ভর করবে না।
প্রতি ম্যাচের ২২তম মিনিটের কাছাকাছি সময়ে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে এই বিরতি দেবেন। বিশ্বকাপের চিফ টুর্নামেন্ট অফিসার মানোলো জুবিবিয়া স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাঁশির প্রথম ফুঁ থেকে খেলা আবার শুরু হওয়া পর্যন্ত ঘড়ির কাঁটায় পুরো ৩ মিনিট এই বিরতি চলবে। তবে ২০ বা ২১ মিনিটের মাথায় যদি মাঠে কোনো খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়ে, তবে রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি বুঝে ব্রেকের সময় সমন্বয় করবেন।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই-ই নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির এক অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে, যা ফুটবলকে নিয়ে যাবে এক সম্পূর্ণ নতুন যুগে!