ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জমকালো এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে এবারের ফিফা বিশ্বকাপ। এবার আর ৩২ দল নয়, রেকর্ড ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে ৩৯ দিন ধরে চলবে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ। প্রথম পর্বে দলগুলোকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। মেগা এই আসরকে আরও রোমাঞ্চকর করতে টেনিসের আদলে তৈরি করা হয়েছে নকআউট ব্র্যাকেট। যেখানে চার শীর্ষ দল, স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডকে রাখা হয়েছে আলাদা চার কোয়ার্ড্রেন্টে। ফিফা জানিয়েছে, এই চার পরাশক্তি যদি নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, তবে সেমিফাইনালের আগে কেউ কারও মুখোমুখি হবে না।
প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল সরাসরি চলে যাবে ‘রাউন্ড অব ৩২’-এ। তাদের সঙ্গী হবে ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল। মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগে, শক্তিমত্তা ও র্যাঙ্কিংয়ের বিচারে ১২টি গ্রুপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ‘কঠিন থেকে সহজ’ ক্রমানুসারে সাজানো হলো এবং কোন দুটি দল সরাসরি নকআউটে যাবে, তারও আগাম বাজি ধরা হলো:
গ্রুপ ‘আই’: ফ্রান্স, সেনেগাল, ইরাক, নরওয়ে
গড় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের বিচারে এবারের বিশ্বকাপের আসল ‘গ্রুপ অব ডেথ’ বা মৃত্যুকূপ এটিই। টানা তৃতীয়বার ফাইনালে ওঠার লক্ষ্যে নামবে অন্যতম ফেভারিট ফ্রান্স। কিন্তু তাদের কাজটা মোটেও সহজ হবে না। আফ্রিকান পরাশক্তি সেনেগাল যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো অঘটন ঘটাতে ওস্তাদ। অন্যদিকে আর্লিং হালান্ডের নরওয়েকে টুর্নামেন্টের ‘ডার্ক হর্স’ মনে করা হচ্ছে। আর এশিয়ার প্রতিনিধি ইরাক সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলে যোগ্যতা অর্জন করে এখানে এসেছে, তাই ওরাও সহজে ছেড়ে কথা বলবে না।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: ফ্রান্স ও সেনেগাল।
গ্রুপ ‘এফ’: নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন, তিউনিসিয়া
গড় র্যাঙ্কিং ২৬ নিয়ে এই গ্রুপটি দলগুলোর জন্য বেশ জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। সপ্তম স্থানে থাকা নেদারল্যান্ডসের জন্য প্রতিটি ম্যাচই হবে পরীক্ষা। এশিয়া থেকে সবার আগে কোয়ালিফাই করা জাপান সম্প্রতি ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। অন্যদিকে সুইডেনের আক্রমণে আছেন আলেকজান্ডার ইসাক ও ভিক্টর গিওকেরেসের মতো ভয়ঙ্কর অস্ত্র। আর বাছাইপর্বে একটি গোলও না হজম করা তিউনিসিয়া এবার ইতিহাস গড়ে নকআউটে যেতে মরিয়া।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: নেদারল্যান্ডস ও জাপান।
গ্রুপ ‘এল’: ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ঘানা, পানামা
গত দুই বিশ্বকাপে রানার্স-আপ ও সেমিফাইনাল খেলা ক্রোয়েশিয়া এবারও লম্বা রেসের ঘোড়া। উদ্বোধনী ম্যাচেই তারা মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ডের, যেখানে থমাস টুখেলের অধীনে প্রথমবারের মতো বড় কোনো টুর্নামেন্টে নামবে থ্রি লায়ন্সরা। কার্লোস কুইরোজ তাঁর সমস্ত অভিজ্ঞতা ঢেলে দিয়ে ঘানাকে গ্রুপ পার করানোর ছক কষছেন, আর পানামা এসেছে সেন্ট্রাল আমেরিকার সেরা র্যাঙ্কিংধারী দল হিসেবে। ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার পথ এখানে মোটেও মসৃণ হবে না।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়া।
গ্রুপ ‘সি’: ব্রাজিল, মরক্কো, হাইতি, স্কটল্যান্ড
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশের দুটি দল থাকায় এই গ্রুপে লড়াই হবে সেয়ানে সেয়ানে। কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল হয়তো আগের মতো অপ্রতিরোধ্য নয়, তবুও গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে তারাই এগিয়ে। তবে আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন মরক্কো ২০২২ সালের সেই রূপকথার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ব্রাজিলকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত। স্কটল্যান্ড ও হাইতি মূলত লড়াই করবে তৃতীয় স্থানের জন্য।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: ব্রাজিল ও মরক্কো।
গ্রুপ ‘কে’: পর্তুগাল, ডিআর কঙ্গো, উজবেকিস্তান, কলম্বিয়া
কাগজে-কলমে পর্তুগাল ও কলম্বিয়া শক্তিশালী হলেও প্লে-অফ জিতে আসা ডিআর কঙ্গো বা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া উজবেকিস্তানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ম্যানচেস্টার সিটির আবদুকোদির খুসানভকে নিয়ে গড়া উজবেকদের ডাগআউটে থাকবেন ইতালির বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি ফ্যাবিও ক্যানাভারো। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালিস্ট কলম্বিয়া এবার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: পর্তুগাল ও কলম্বিয়া।
গ্রুপ ‘এইচ’: স্পেন, কেপ ভার্দে, সৌদি আরব, উরুগুয়ে
ইউরো ২০২৪ জয়ের পর এবার বিশ্বজয়ের অভিযানে নামা স্পেন অনেকেরই হট ফেভারিট। মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ের বিরুদ্ধে স্পেনের ম্যাচটি দেখার জন্য মুখিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে অঘটন ঘটানো সৌদি এবার কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে তৃতীয় স্থানের লড়াইয়ে নামবে।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: স্পেন ও উরুগুয়ে।
গ্রুপ ‘ই’: জার্মানি, কুরাসাও, আইভরি কোস্ট, ইকুয়েডর
গড় র্যাঙ্কিংয়ের বিচারে এটি টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন হলেও মাঠের লড়াইয়ে এটি বেশ কঠিন। টানা দুবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া জার্মানি এবার নকআউটে যেতে মরিয়া এবং তারা ছন্দেও আছে। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার ঠিক পেছনে থেকে শেষ করা ইকুয়েডরের মাঝমাঠ সামলাবেন চেলসির মোইসেস কাইসেদো। অন্যদিকে আফ্রিকান পরাশক্তি আইভরি কোস্ট সম্প্রতি এক প্রস্তুতি ম্যাচে ফ্রান্সকে হারিয়ে চমকে দিয়েছে। আর কুরাসাও ডেবিউট্যান্ট হিসেবে পুরোই অচেনা শক্তি।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: জার্মানি ও ইকুয়েডর।
গ্রুপ ‘জে’: আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার বেশ সহজ ড্র পেয়েছে। লিওনেল মেসির দল অনায়াসেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে দ্বিতীয় স্থানের জন্য অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হবে। এশিয়ান কাপের রানার্স-আপ জর্ডান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এলেও বাছাইপর্বে প্রতিপক্ষের মাঠে অপরাজিত থেকে ৩২ গোল করেছে, ফলে তারাও কামড় দিতে প্রস্তুত।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়া।
গ্রুপ ‘এ’: মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র
গড় র্যাঙ্কিং ৩৫ নিয়ে এটি অন্যতম সহজ গ্রুপ। ঘরের মাঠের বিশাল সুবিধা নিয়ে সহ-স্বাগতিক মেক্সিকোর শীর্ষ দুইয়ে থাকা প্রায় নিশ্চিত। এশিয়ান বাছাইপর্বে অপরাজিত থাকা দক্ষিণ কোরিয়া দ্বিতীয় স্থানের জন্য লড়াই করবে ৭৪ বছর বয়সী কোচ মিরোস্লাভ কৌবেকের চেক প্রজাতন্ত্রের সাথে। দক্ষিণ আফ্রিকা কখনও নকআউটে না গেলেও এবার সেরা তৃতীয় দল হিসেবে সুযোগ খোঁজার চেষ্টা করবে।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়া।
গ্রুপ ‘জি’: বেলজিয়াম, মিশর, ইরান, নিউজিল্যান্ড
বেলজিয়ামের ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’ অতীত হলেও রুডি গার্সিয়ার দলের জন্য এটি বেশ আরামদায়ক গ্রুপ। কারণ তাদের বাকি তিন প্রতিপক্ষের কেউ আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। মোহাম্মদ সালাহর মিশর এখনও বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ না জিতলেও এবার ইরান ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ইতিহাস গড়তে চাইবে। অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে ইরানের প্রস্তুতি পুরোপুরি লণ্ডভণ্ড, যার প্রভাব মাঠে পড়তে বাধ্য। আর নিউজিল্যান্ড টুর্নামেন্টের সর্বনিম্ন র্যাঙ্কিংয়ের দল হিসেবে পাহাড় ডিঙানোর লড়াইয়ে নামবে।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: বেলজিয়াম ও মিশর।
গ্রুপ ‘ডি’: যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া
গড় র্যাঙ্কিং অনেক ওপরে থাকলেও সহ-স্বাগতিক আমেরিকার জন্য এটি বেশ সহজ ড্র। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ১৬ নম্বরে থাকা মার্কিন দলের নতুন কোচ মরিসিও পচেত্তিনো ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের ওপর ভরসা করে ছক কষছেন। কোনো মহাতারকা না থাকলেও এই গ্রুপে তীব্র লড়াই হবে। প্লে-অফ পেরিয়ে আসা তুরস্ক আমেরিকার সাথে পরের রাউন্ডে যাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে। প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়া র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকলেও অঘটন ঘটাতে মুখিয়ে আছে।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক।
গ্রুপ ‘বি’: কানাডা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কাতার, সুইজারল্যান্ড
গড় ফিফা র্যাঙ্কিং ৪২ নিয়ে এটি এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে দুর্বল গ্রুপ। তবে বড় দলের অভাব থাকলেও এই গ্রুপের দলগুলোর মধ্যে তীব্র হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। সুইজারল্যান্ড বড় আসরে নকআউটে খেলার রেকর্ড নিয়ে গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। সহ-স্বাগতিক কানাডা বিশ্বকাপে বরাবরই ব্যর্থ, তবে এবার জেসি মার্শের অধীনে ঘরের মাঠের সুবিধা নিতে চাইবে তারা। ইতালিকে প্লে-অফে বিদায় করে দেওয়া বসনিয়া এবং এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন কাতার, উভয় দলই যে কোনো অঘটন ঘটিয়ে সরাসরি টিকিট কাটতে পারে।
সরাসরি পরের রাউন্ডে যাওয়ার ফেভারিট: সুইজারল্যান্ড ও কানাডা।