‘মেক্সিকান ওয়েভ’ থেকে ঝাল মরিচের ম্যাজিক!

বৃহস্পতিবার যখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য ও রাজকীয় রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকার দেশ মেক্সিকো। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তিন-তিনবার ফুটবল বিশ্বকাপ একক ও যৌথভাবে আয়োজন করার এক অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়ল তারা।

এর আগে ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালেও মারাদোনা-পেলের দেশে বসেছিল এই বিশ্বমঞ্চের আসর। তবে এবারের আসরটি আরও বেশি জমকালো এবং বিশালাকার; কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে মেক্সিকো।

কিন্তু মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত লুইস হাভিয়ের কাম্পুজানো পিনার কাছে এই বিশ্বকাপের তাৎপর্য কেবল মাঠের ৯০ মিনিটের ফুটবল বা গোল-অ্যাসিস্টের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে ফুটবলকে হাতিয়ার করে মেক্সিকোর সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক শক্তি এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উন্মুক্ত করার এক দারুণ 'সফট পাওয়ার' বা মহাকূটনীতি।

মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘টাইমসপোর্ট’-এর সাথে আলাপকালে রাষ্ট্রদূত কাম্পুজানো এক চটকদার তথ্য শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, মেক্সিকোর সাথে এশিয়ার সংস্কৃতির গভীর মিল রয়েছে, যা হয়তো অনেকেই জানেন না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, আজ আমরা যে ঝাল মরিচ খাই, তার উৎপত্তি কিন্তু মেক্সিকোতে। তাই মালয়েশিয়ার মানুষ যখনই কোনো ঝাল বা স্পাইসি খাবার উপভোগ করেন, তখনই অজান্তেই মেক্সিকোর সাথে তাঁদের এক খুদে সংযোগ তৈরি হয়ে যায়!

শুধু মরিচই নয়, রাষ্ট্রদূত মনে করিয়ে দেন. ফুটবল মাঠে দর্শকরা যে দুহাত তুলে ঢেউ খেলান, সেই বিশ্ববিখ্যাত ‘মেক্সিকান ওয়েভ’-এর জন্মও হয়েছিল মেক্সিকোর মাটিতেই। এটি আসলে একতা আর আনন্দ উদযাপনের এক বৈশ্বিক প্রতীক।

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত লুইস হাভিয়ের কাম্পুজানো পিনা ছবি:সংগৃহীথ
বিশ্বকাপের পর সাধারণত অনেক দেশই স্টেডিয়াম রক্ষণাবেক্ষণের খরচে দেউলিয়া হয়ে যায়, কিন্তু মেক্সিকো হেঁটেছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। তারা বিশ্বকাপকে কেবল বড় বড় স্টেডিয়াম বানানোর চকমকে আয়োজন হিসেবে দেখছে না; বরং একে কাজে লাগিয়ে বিমানবন্দর, গণপরিবহন এবং পাবলিক ফেসিলিটিজের মতো দেশের মূল পরিকাঠামো বদলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, মেক্সিকো সরকার এবার চালু করেছে সোশ্যাল ওয়ার্ল্ড কাপ বা সামাজিক বিশ্বকাপ উদ্যোগ। এর লক্ষ্য হলো, বিশ্বকাপের সুফল যেন শুধু বড় বড় আয়োজক শহরের ধনকুবেরদের পকেটে না যায়, বরং প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায়। এই প্রজেক্টের অধীনে সাধারণ অঞ্চলের স্কুল, পার্ক এবং জনসাধারণের জায়গাগুলো সংস্কার করা হচ্ছে এবং বিশ্বকাপের সাথে যুক্ত বিভিন্ন কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম তৈরি করা হচ্ছে।

১০ বছরের বালকের সেই জন্মদিন ও বিশ্বকাপ ট্রফি: কাম্পুজানো ফুটবলের আবেগের শক্তিটা খুব ভালো করেই বোঝেন। নিজের স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানান, ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন মাত্র ১০ বছরের এক পুঁচকে বালক। ২১ জুন বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে যখন পেলে-রবার্তো রিভেলিনোদের ব্রাজিল ৪-১ ব্যবধানে ইতালিকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিখ্যাত ‘জুল রিমে ট্রফি’ উঁচিয়ে ধরেছিল, কাকতালীয়ভাবে সেদিনই ছিল তাঁর জন্মদিন!

৫৬ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রাজকীয় ফুটবল উৎসবের স্মৃতি আজ তাঁর মনে স্ফটিকের মতো পরিষ্কার। রাষ্ট্রদূত বিশ্বাস করেন, বর্তমানের বিশ্বজুড়ে চলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধবিগ্রহের বাজারে এই বিশ্বকাপ আবারও বিশ্ববাসীকে এক সুতোয় বাঁধবে। মালয়েশিয়ার সাথে মেক্সিকোর এই যৌথ মেলবন্ধন শেষ পর্যন্ত দু’দেশের পর্যটন ও সংস্কৃতিকে কতখানি উসকে দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়!