বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে কতটা তৈরি মেক্সিকোর ‘এল ট্রি’ বাহিনী?

রাত থেকেই উত্তর আমেরিকার মাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের জমকালো আসর। তবে তিন যৌথ স্বাগতিক দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাইমলাইট এবং ‘মহাচাপ’ যার ওপর, সে হলো মেক্সিকো! র‍্যাংকিংয়ের ১৫ নম্বরে থাকা এই লাতিন পরাশক্তিকে শুধু টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন করলেই চলবে না, ঘরের মাঠে মাঠের লড়াইয়েও টেক্কা দিতে হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাকে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে লজ্জাজনক বিদায়ের সেই দগদগে ক্ষত ভুলে ২০২৫ সালের গোল্ড কাপ ও নেশনস লিগ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে এবার ঘরের মাঠে নিজেদের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া মেক্সিকোর ‘এল ট্রি’ ব্রিগেড। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে কেমন তাদের শক্তি-দুর্বলতা আর কেমনই বা তাদের রণকৌশল? চলুন দেখে নেয়া যাক এক জম্পেশ ও চটপটে চুলচেরা বিশ্লেষণে।

Mexico 03
রক্ষণাত্মক ৪-৩-৩ ফরমেশন:
মেক্সিকোর ডাগআউটে এখন কোনো উথাল-পাথাল আক্রমণাত্মক ফুটবলের গল্প নেই, বরং আছে কড়া পেশাদারিত্ব ও বাস্তববাদ। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দলের হাল ধরা অভিজ্ঞ কোচ হাভিয়ের আগিরেস মেক্সিকান ফুটবলকে দিয়েছেন এক নিরেট ও সুশৃঙ্খল রক্ষণাত্মক পরিচয়। ১৯৮৬ সালে ঘরের মাঠে মেক্সিকোর হয়ে বিশ্বকাপ খেলা ৫৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই কিংবদন্তি কোচ দলকে খেলান এক নতুন ঘরানার ৪-৩-৩ ফরমেশনে।

আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের চরম শারীরিক ধকল সামলাতে তৈরি এই সিস্টেমে মেক্সিকো হাই-রিস্ক প্রেসিংয়ের চেয়ে নিজেদের রক্ষণভাগ নিশ্ছিদ্র রাখাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। যার প্রমাণ মিলেছে ২০২৫ সালের গোল্ড কাপে, পুরো টুর্নামেন্টে তারা মাত্র ২.১ এক্সপেক্টেড গোল হজম করে ৪টি ম্যাচ ক্লিন শিট রেখেছিল! তবে এই ডিফেন্সিভ ফুটবলের বড় দুর্বলতা হলো মাঝমাঠের সৃজনশীলতার অভাব। ডিফেন্স থেকে ফরোয়ার্ড লাইনে বল জোগান দেয়ার মতো চতুর মিডফিল্ডারের অভাবে আক্রমণভাগে অনেক সময় ছন্দপতন ঘটে। ফলে আলভারাডোর মতো গতিময় উইঙ্গারদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয় প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার জন্য।

Mexico 01
ট্রাম্প কার্ড গোলমেশিন রাউল হিমেনেস:
মেক্সিকোর আক্রমণভাগের সমস্ত আশা-ভরসা যার ওপর টিকে আছে, তিনি হলেন ৩৪ বছর বয়সী তারকা স্ট্রাইকার রাউল হিমেনেস। ১২৩ ম্যাচে ৪৪ গোল করে দেশের ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিমেনেস বর্তমানে তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা ছন্দে রয়েছেন। শেষ দুই ক্লাবের মরশুমে সব মিলিয়ে ২৪টি গোল এবং ২০২৫ সালে দেশের জার্সিতে ৭টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ৭টি গোল করে তিনি এখন রীতিমতো উড়ছেন।

হিমেনেসের দুর্দান্ত এরিয়াল ক্ষমতা, ক্লিনিকাল ফিনিশিং আর নিচে নেমে ডিফেন্সকে সাহায্য করার মানসিকতা এই রক্ষণাত্মক দলের প্রধান চালিকাশক্তি। ট্যাকটিক্যালি হিমেনেস হলেন এই দলের নিউক্লিয়াস, তিনি প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের টেনে নিজের পজিশন থেকে বের করে আনেন, যা উইঙ্গারদের ভেতরে ঢুকে গোল করার ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দেয়। তবে মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো, কোনো কারণে যদি হিমেনেস ইনজুরিতে পড়েন, তবে দলে তাঁর মতো বিকল্প কোনো বিশ্বস্ত স্ট্রাইকার বা গোলস্কোরার নেই, যা পুরো আক্রমণভাগকে পঙ্গু করে দিতে পারে।

Mexico 02
গ্রুপ ‘এ’ এবং নকআউটের রোডম্যাপ:
স্বাগতিক দেশ হিসেবে কোনো কঠিন বাছাইপর্ব খেলতে না হলেও, মেক্সিকো নিজেদের প্রস্তুতি সেরেছে ২০২৫ সালের গোল্ড কাপের ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রকে ২-১ গোলে হারিয়ে আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘এ’-তে মেক্সিকোর প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চেকিয়া (চেক প্রজাতন্ত্র)।

কাগজে-কলমে এই গ্রুপটি মেক্সিকোর জন্য বেশ সুবিধাজনক। আজ উদ্বোধনী ম্যাচেই মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে মেক্সিকান ফ্যানদের গগনবিদারী চিৎকারের সামনে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে পূর্ণ ৩ পয়েন্ট তুলে নেওয়াই হবে তাদের প্রথম লক্ষ্য। তবে কাউন্টার অ্যাটাকে পারদর্শী দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে। বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ের ১৫ নম্বর দলটির জন্য গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই নূন্যতম যোগ্যতা এবং নকআউটের সহজ সমীকরণ মেলাতে গ্রুপ টপকানো ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প রাস্তা নেই। অভিজ্ঞ কোচের নিরেট ডিফেন্স আর ঘরের মাঠের লাখো সমর্থকের উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে ‘এল ট্রি’ এবার কোয়ার্টার ফাইনালের জুজু কাটাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়!