দীর্ঘ প্রতীক্ষা, তুমুল উত্তেজনা আর কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের উন্মাদনাকে সঙ্গী করে অবশেষে রাত ১টায় মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে কিক-অফ হতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ। ইতিহাসের বৃহত্তম এই ফুটবল আসরের উদ্বোধনী ম্যাচেই মুখোমুখি হচ্ছে গ্রুপ ‘এ’-এর দুই পরাশক্তি, সহ-স্বাগতিক মেক্সিকো এবং আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম সেরা দল দক্ষিণ আফ্রিকা।
কাকতালীয়ভাবে, ঠিক ১৬ বছর আগে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটিতেও এই দুই দল জোহানেসবার্গে মুখোমুখি হয়েছিল, যা ১-১ গোলে ড্র হয়। এবার মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক চত্বরে লাখো চেনা দর্শকের সামনে মেক্সিকানদের হেক্সা বা বিশেষ মিশন শুরু হতে যাচ্ছে। কেমন হলো দুই দলের খুঁটিনাটি আর রণকৌশল? চলুন দেখে নেয়া যাক এক জম্পেশ ও চটপটে বিশ্লেষণে।
মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে আজ এক অনন্য রেকর্ডের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন কোচ হাভিয়ের আগিরেস। ২০০২ এবং ২০১০ সালের পর এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো মেক্সিকোকে বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। এর আগে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল মেক্সিকো। এবারও ঘরের মাঠের চেনা কন্ডিশনকে কাজে লাগিয়ে আরও গভীরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন কোচ।
ম্যাচের ঠিক আগমুহূর্তে এক হুঙ্কারে আগিরেস বলেন, "আমি একটুও নার্ভাস বা চিন্তিত নই, আমি সত্যি ভীষণ উত্তেজিত। আমি নিজেকে অন্যতম ভাগ্যবান মনে করি। আমরা আমাদের সেরা শারীরিক ও মানসিক ছন্দে আছি। আমার দলের অনেক খেলোয়াড়ই আগে কখনো এমন বিশ্বমঞ্চের উন্মাদনা অনুভব করেনি।
তিনি আরও যোগ করেন, আমি ওদের একটা কথাই বলেছি, ঘরের মাঠে খেলার কোনো বিকল্প বা মূল্য হয় না। ইংল্যান্ড যেমন একবারই নিজেদের দেশে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, এরপর আর কখনো পারেনি। আমার বিশ্বাস, দেশের প্রতিটি মানুষ আজ আমাদের পাশে থাকবে। উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে খেলোয়াড় হিসেবে মেক্সিকোর হয়ে সবগুলো ম্যাচ খেলেছিলেন আগিরেস।
মেক্সিকোর সম্ভাব্য একাদশের দিকে তাকালে দেখা যাবে অভিজ্ঞতার এক বিশাল পাহাড়। গোলপোস্টের নিচে আজ মাঠে নামলেই অনন্য এক ইতিহাস গড়বেন গোলরক্ষক গুইলারমো ওচোয়া; এটি হতে যাচ্ছে তাঁর ক্যারিয়ারের রেকর্ড ষষ্ঠ (৬ষ্ঠ) বিশ্বকাপ! অন্যদিকে মেক্সিকোর আক্রমণভাগের সব দায়িত্ব থাকছে সদ্য ফুলহ্যাম ছেড়ে আবারও উলভসে যোগ দেয়া ৩৫ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলমেশিন রাউল হিমেনেসের কাঁধে।
১২৪ ম্যাচে ৪৫ গোল করে দেশের ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিমেনেস দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্স গুঁড়িয়ে দিতে পুরোপুরি তৈরি। পাশাপাশি আজ অধিনায়ক এডসন আলভারেজ দেশের হয়ে নিজের ৯৯তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে মাঠে নামবেন।
২০১০ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজন করার পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে খেলার টিকিট পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দলটিতে মূলত ঘরোয়া লিগের একঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের মেলা বসলেও, আক্রমণভাগের মূল কাণ্ডারি বার্নলির তারকা স্ট্রাইকার লাইল ফস্টার। মেক্সিকোর নিরেট ডিফেন্স ভাঙতে ফস্টারের গতির ওপরই ভরসা রাখছেন কোচ হুগো ব্রুস।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর রেকর্ড এক কথায় দুর্দান্ত। শেষ ৭টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে ‘এল ট্রি’ বাহিনী, যার মধ্যে ৫টি জয় ও ২টি ড্র রয়েছে। ১৯৯৪ সালে নরওয়ের কাছে ১-০ গোলে হারার পর উদ্বোধনী ম্যাচে আর কখনো হারেনি তারা।
অন্যদিকে, বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার খেলা ৯টি ম্যাচের একটিও গোলশূন্য (০-০) ড্র হয়নি। বিশ্বমঞ্চে তাদের একমাত্র ২টি জয় এসেছিল ২০০২ সালে স্লোভেনিয়া এবং ২০১০ সালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে। স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়টিই বিশ্বকাপে বাফানা বাফানার একমাত্র ক্লিন শিট (গোল হজম না করার রেকর্ড)।
ফুটবল পণ্ডিতদের সাম্প্রতিক প্রেডিকশন এবং চেনা কন্ডিশনের গরম হাওয়া—সবকিছুই ইঙ্গিত করছে আজ মাঠের লড়াই শেষে মেক্সিকো ৩-১ ব্যবধানে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে শুভ সূচনা করতে পারে। তবে সব হিসাব-নিকাশ তোলা থাকল মাঠের ৯০ মিনিটের জন্য, এবার ফুটবলই কথা বলুক!
মেক্সিকোর সম্ভাব্য একাদশ: ওচোয়া; সানচেজ, মন্তেস, আলভারেজ, গ্যালার্দো; গুতিয়ারেজ, ফিদালগো, পিনেদা; আলভারাডো, হিমেনেস, কুইনোনেস।
দক্ষিণ আফ্রিকার সম্ভাব্য একাদশ: উইলিয়ামস; মুদাউ, ম্বোকাজি, ওকন, মোদাইবা; ম্বাথা, সিথোলে, মোকোয়েনা; আপোলিস, ফস্টার, মোরেমি।