শাকিরা ঝড়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের জমকালো উদ্বোধন

অবশেষে সব বিতর্ক ধরনের আর জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পর্দা উঠল ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের! বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ৪৮ দলের এই মেগা টুর্নামেন্ট।

তবে মাঠের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরা যখন তাঁর চেনা ছন্দে কোমর দোলালেন, তখন ৮০  হাজার ধারণক্ষমতার গ্যালারিতে বসা দর্শকরা আসন ছেড়ে নাচতে বাধ্য হলেন। কিন্তু মাঠের ভেতরের এই রাজকীয় আমেজ স্টেডিয়ামের বাইরে বের হতেই রূপ নিল এক চরম বিশৃঙ্খলা আর মারামারিতে!

WC Opening Ceremony 01
মেক্সিকো সিটির মূল ফ্যান জোনে খেলা দেখা ও ঢোকা নিয়ে ফুটবল ভক্তদের উন্মাদনা এতটাই নোংরা পর্যায়ে পৌঁছাল যে, স্বয়ং নগর অফিশিয়ালদের লাউডস্পিকারে বলতে হলো, তোমরা পশুর মতো আচরণ করছ! এতেও শান্ত করা যায়নি স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের।

ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজটেকা স্টেডিয়াম, যা এর আগে ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের সাক্ষী ছিল, এই টুর্নামেন্টের জন্য সেটিকে বিশেষভাবে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল এক বিশাল আকৃতির বিশ্বকাপ ট্রফির রেপ্লিকা, যাকে ঘিরে চারপাশের শত শত নৃত্যশিল্পী মনমুগ্ধকর পারফর্ম করছিলেন আর আকাশে উড়ছিল চোখ ধাঁধানো আতশবাজির রোশনাই।

WC Opening Ceremony 03
তবে অনুষ্ঠানের আসল পারদ চড়ে যখন কলম্বিয়ান গায়িকা শাকিরা এবং নাইজেরিয়ান সেনসেশন বার্না বয় মঞ্চে এসে যৌথভাবে এই বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’ গাওয়া শুরু করেন। পুরো স্টেডিয়াম তখন উল্লাসে ফেটে পড়ে।

স্টেডিয়ামের ভেতরে যখন উৎসবের আমেজ, তখন মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্র জোকালো প্লাজার অফিশিয়াল ফ্যান জোনে ম্যাচ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে তৈরি হয় এক ভয়াবহ নরক গুলজার পরিস্থিতি।

জায়ান্ট স্ক্রিনে মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচটি দেখার জন্য হাজার হাজার ফুটবল পাগল ভক্ত একসাথে ফ্যান জোনে ঢোকার চেষ্টা করলে চরম হুড়োহুড়ি আর ঠেলাঠেলি শুরু হয়। মূলত বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ঠেকাতে ওই চত্বরে বিশাল মেটাল ব্যারিকেড বা লোহার খাঁচা বসিয়েছিল প্রশাসন, যার ফলে সাধারণ মানুষের ঢোকার রাস্তা সরু হয়ে যায়।

WC Opening Ceremony 02
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাওয়া এক নগর অফিশিয়াল মেগাফোন হাতে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ঠেলাঠেলি বন্ধ করো, এখানে বাচ্চারা আছে! তোমরা একদম পশুর মতো আচরণ করছ! এই কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে অনেক উগ্র সমর্থক পুলিশের দিকে পানির বোতল ছুঁড়ে মারেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গালাগাল করতে থাকেন।

২৫ বছর বয়সী বিক্ষুব্ধ এক সমর্থক হাভিয়ের মাসিয়েল ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, পুরো পরিস্থিতিটা একটা পাগলামি! এখানে এর চেয়ে অনেক ভালো ব্যবস্থাপনা করা যেত। একপর্যায়ে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় প্রশাসন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা দেয়, ফ্যান জোনটি ‘হাউসফুল’ হয়ে গেছে, তাই ভক্তরা যেন অন্য প্লাজায় চলে যান।

World Cup Opening 3
শিক্ষকদের আন্দোলন ও প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতি:
মেক্সিকোর বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শিনবাউমের এই ফ্যান জোনে বসে সাধারণ মানুষের সাথে খেলা দেখার কথা ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষকদের তীব্র বিক্ষোভ ও ঘেরাও কর্মসূচির কারণে শেষ মুহূর্তে তিনি সেখানে যাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। মাঠের বাইরের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা আর ফ্যান জোনের বিশৃঙ্খলা ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্ব অবশ্য এখন বুঁদ হয়ে আছে ফুটবলের জাদুতে।

ইতিহাস সৃষ্টি করা এই বিশ্বকাপটি মেক্সিকোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে ফাইনালসহ মোট ১০৪টি ম্যাচ খেলা হবে। আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মাঠে ফাইনাল ম্যাচের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে এই বিশ্বযজ্ঞের। মাঠের বাইরের এই তপ্ত শুরু শেষ পর্যন্ত মাঠের ফুটবলে কতটা সাম্বার ছন্দ এনে দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়!