ভোরে ফিলাডেলফিয়ায় লাতিন বনাম আফ্রিকান বারুদ

উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে ভোরে ফিলাডেলফিয়ার মাঠে শুরু হচ্ছে ই-গ্রুপের এক চরম ভাগ্যনির্ধারক এবং আগুনে মহারণ। মুখোমুখি হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার ইস্পাত কঠিন দল ইকুয়েডর এবং আফ্রিকার অন্যতম পরাশক্তি আইভরি কোস্ট। এই গ্রুপে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ফেভারিট হিসেবে থাকায়, নকআউট পর্বের টিকিট পেতে নিজেদের প্রথম ম্যাচই দুই দলের জন্যই কার্যত বাঁচা-মরার লড়াই।

২০১৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরেছে আইভরি কোস্ট, আর তাদের স্বাগত জানাতে তৈরি গত দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অপরাজেয় তকমা গায়ে লাগানো ইকুয়েডর। খেলাটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় সোমবার ভোর ৫টায়।

Ivory Coast v Ecuador 05
দুই বছর আগে ব্রাজিলের কাছে হারের পর ইকুয়েডরের হটসিটে বসেছিলেন কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে। তাঁর জাদুকরী ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া ‘লা ত্রি’ এরপর টানা ১৯টি ম্যাচে কোনো হারের মুখ দেখেনি! অন্যদিকে, এমেরসে ফায়ে’র অধীনে আইভরি কোস্টও টানা চার ম্যাচ জিতে ফুরফুরে মেজাজে আমেরিকায় পা রেখেছে। ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪- তিনবার বিশ্বকাপ খেলেও প্রতিবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া আইভরিয়ানদের লক্ষ্য এবার যে কোনো মূল্যে ইতিহাস গড়ে নকআউটে যাওয়া।

গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে আইভরি কোস্ট শিবিরে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে রোমার ডিফেন্ডার ইভান এনডিকার ইনজুরি। গত মাসের রোম ডার্বিতে উরুর চোটে পড়া এই তারকা আজকের ম্যাচে খেলবেন না বললেই চলে। তবে আক্রমণভাগে কোচের হাতে রয়েছে তারকার মেলা।

Ivory Coast v Ecuador 07
আমাদ দিয়ালো, সাইমন আদিংগ্রা, নিকোলাস পেপে এবং তরুণ উইঙ্গার ইয়ান দিওমান্দে, সবাই শুরুর একাদশে জায়গা পেতে মরিয়া। দলে সেবাস্তিয়ান হ্যালার না থাকায় আক্রমণভাগের একদম সামনে আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে ওয়াহি, ইভান গুয়েসান্দ এবং অ্যাঞ্জে-ইয়োয়ান বনির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই চলছে।

অন্যদিকে, ইকুয়েডর শিবিরের একমাত্র দুশ্চিন্তা তাদের বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখানো অধিনায়ক এনার ভ্যালেন্সিয়াকে নিয়ে। মৃদু চোটের কারণে তাঁর খেলা নিয়ে সামান্য সংশয় থাকলেও কিক-অফের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকারের জন্য অপেক্ষা করবে টিম ম্যানেজমেন্ট।

Ivory Coast v Ecuador 03
তবে ইকুয়েডরের আসল শক্তি তাদের মেরুদণ্ড। চেলসির মাঝমাঠের ইঞ্জিন মোইসেস কাইসেডোর পাশাপাশি আর্সেনালের পিয়েরো হিলকাপি, পিএসজি-র উইলিয়ান পাচো এবং টিনএজ সেনসেশন কেন্দ্রি বায়েসকে নিয়ে গড়া এই দলটিকে ভাঙা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই দুঃস্বপ্ন।

আইভরি কোস্টের এটি চতুর্থ বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ হলেও বাছাইপর্বে তাদের রেকর্ড ছিল অবিশ্বাস্য। আফ্রিকার উইং থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের মূল পর্বে আসার পথে ১০টি বাছাই ম্যাচের একটিতেও কোনো গোল হজম করেনি আইভরি কোস্ট! তিউনিসিয়ার সাথে যৌথভাবে এই অনন্য কীর্তি গড়েছে তারা। শুধু তাই নয়, বাছাইপর্বে আইভরি কোস্টের হয়ে সর্বোচ্চ ১৫ জন ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড় গোল করেছেন, যা যেকোনো আফ্রিকান দলের চেয়ে বেশি।

Ivory Coast v Ecuador 06
অন্যদিকে, ইকুয়েডর তাদের পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছে। ২০০৬ সালে কেবল একবারই তারা শেষ ষোলোতে উঠেছিল, যেখানে ডেভিড বেকহ্যামের ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। বিশ্বকাপে খেলা নিজেদের ১৩টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র ২টি ড্র করেছে ইকুয়েডর। এবারের বিশ্বকাপে আসার পথটাও তাদের ছিল রাজকীয়; ল্যাটিন অঞ্চলের কঠিন বাছাইপর্বে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ঠিক পেছনে থেকে দ্বিতীয় হয়ে টিকিট কেটেছে তারা, যা তাদের ইতিহাসের যৌথসেরা সাফল্য। ১৮ ম্যাচে মাত্র ৫ গোল হজম করে লাতিন আমেরিকার সেরা ডিফেন্সের তকমাও ছিল তাদের গায়ে; যেখানে তারা হেরেছে মাত্র দুটি ম্যাচ, তাও আবার আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ঘরের মাঠে গিয়ে।

সব হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে, একদিকে আইভরি কোস্টের গোল না খাওয়ার দুর্ভেদ্য রেকর্ড, অন্যদিকে ইকুয়েডরের ১৯ ম্যাচের অপরাজিত অহংকার, ফিলাডেলফিয়ার মাঠে এক ইঞ্চি জমিও কেউ কাউকে ছেড়ে দেবে না। মাঠের লড়াইয়ে লাতিন সাম্বা নাকি আফ্রিকান গতি শেষ হাসি হাসবে, তা দেখার জন্য উন্মুখ ফুটবল বিশ্ব!