প্রীতি ম্যাচগুলোর ব্যর্থতাকে স্রেফ ‘মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর কৌশল’ হিসেবে প্রমাণ করে ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই রাজকীয় জয় তুলে নিয়েছে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। ডালাসের জেরি জোন্সের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গম্বুজ স্টেডিয়ামে গোলবন্যার এক রোমাঞ্চকর ম্যাচে শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়েছে থ্রি-লায়ন্সরা। ইংল্যান্ডের পক্ষে অধিনায়ক হ্যারি কেইন জোড়া গোল করেন, বাকি দুটি গোল আসে জুড বেলিংহ্যাম ও বদলি খেলোয়াড় মার্কাস রাশফোর্ডের পা থেকে। ক্রোয়েশিয়ার হয়ে গোল দুটি শোধ করেন মার্টিন বাতুরিনা ও পেতার মুসা।
আর্লিংটনের প্রখর ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থেকে বাঁচতে ডালাসের স্টেডিয়ামের ছাদ বন্ধ করে ভেতরের তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনা হয়েছিলো। তবে মাঠের ভেতরের উত্তেজনা ছিলো ফুটন্ত। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ও কিছুটা এলোমেলো ফুটবল খেলতে থাকে।
ম্যাচের ডেডলক ভাঙে ডেক্লান রাইসের একটি কর্নার থেকে। ননি মাদুয়েকেকে ডি-বক্সে ফাউল করেন ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদ্রিচ। রেফারি ক্লেমঁ তুরপাঁ পেনাল্টির বাঁশি বাজালে স্পট কিক নিতে আসেন হ্যারি কেইন। তবে গত বিশ্বকাপের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে মিসের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে কেইনের প্রথম শটটি দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ।
নাটকীয়তার তখনও বাকি ছিলো। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি পরীক্ষায় দেখা যায় কেইন শট নেওয়ার আগেই লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন লিভাকোভিচ। পুনরায় পেনাল্টি নেওয়ার নির্দেশ দেন রেফারি। এবার আর ভুল করেননি কেইন; লিভাকোভিচকে ভুল দিকে পাঠিয়ে বল জালে জড়ান তিনি। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে সর্বোচ্চ গোল এখন কেইনের। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের জার্সিতে সর্বোচ্চ গোলও তার। তবে এই জায়গাটায় ভাগীদার তিনি একাই নন। আপাতত আছেন আরও একজন। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার।
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ১১ নম্বরে থাকা ক্রোয়েশিয়া। মাঝমাঠে জুড বেলিংহামের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ শাণায় তারা। পেতার সুচিচের পাস থেকে মার্টিন বাতুরিনা জোরালো শটে গোল করে ক্রোয়েশিয়াকে ১-১ সমতায় ফেরান।
ম্যাচের পরিসংখ্যান:
- পজিশন:
ইংল্যান্ড ৫৫% — ৪৫% ক্রোয়েশিয়া
- শট অন টার্গেট:
ইংল্যান্ড ১০ — ৫ ইরাক
- শট অফ টার্গেট:
ইংল্যান্ড ১১ — ৫ ক্রোয়েশিয়া
- কর্নার:
ইংল্যান্ড ৮ — ২ ক্রোয়েশিয়া
- ফাউল:
ইংল্যান্ড ১০ — ১২ ক্রোয়েশিয়া
- ফলাফল:
ইংল্যান্ড ৪ — ২ ক্রোয়েশিয়া
কিছুক্ষণ পরেই রাইসের নিখুঁত কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে ইংল্যান্ডকে আবারও ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন কেইন। কিন্তু প্রথমার্ধের শেষদিকে ইংলিশ রক্ষণভাগের অতিরিক্ত উদারতা ও ডিফেন্ডার রিস জেমসের পজিশন ভুলের সুযোগ নিয়ে জোসিপ সুতালো ও ইভান পেরিসিচের সহায়তায় ফাঁকায় থাকা পেতার মুসা নিখুঁত ভলিতে গোল করলে ২-২ সমতায় শেষ হয় প্রথমার্ধ।
প্রথমার্ধে দলের খেলায় অতিরিক্ত স্নায়বিক উত্তেজনা ও ভুল সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন না টমাস টুখেল ও তার সহকারী অ্যান্থনি ব্যারি। তবে দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ অন্য এক অপ্রতিরোধ্য ইংল্যান্ডকে দেখা যায়। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন পুরো ম্যাচে দুর্দান্ত খেলা জুড বেলিংহ্যাম। এলিয়ট অ্যান্ডারসনের পাস থেকে গতি ও ক্ষিপ্রতায় ক্রোয়েশিয়ান রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে বক্সে ঢুকে চমৎকার ফিনিশিংয়ে ইংল্যান্ডকে ৩-২ গোলে এগিয়ে নেন এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
ম্যাচের শেষের দিকে সমতায় ফিরতে মরিয়া ক্রোয়েশিয়ার বদলি খেলোয়াড় মার্কো পাসালিচ একটি নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করেছিলেন। তবে গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড বুদ্ধিদীপ্ত ও অবিশ্বাস্য এক ব্লকের মাধ্যমে ইংল্যান্ডকে রক্ষা করেন।
এরপর টুখেলের ট্যাকটিক্যাল বদলি খেলোয়াড়রা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। বুকায়ো সাকার পাস থেকে জেড স্পেন্স প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিচু শটে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ক্রোয়েশিয়ার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন আরেক বদলি ফরোয়ার্ড মার্কাস রাশফোর্ড। ৪-২ গোলের এই দুর্দান্ত জয়ে গ্রুপ পর্বে পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড।