হাইতির স্ট্রাইকার পিয়েরোতের অবিশ্বাস্য জীবনসংগ্রাম

‘আমার মাকে সিদ্ধান্ত নিতে হতো’ তিনি নিজে খাবেন নাকি আমাদের মুখে খাবার তুলে দেবেন’। মাত্র একটি লাইনেই লুকিয়ে আছে এক বুক কাঁপানো নির্মম সত্য। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সি-গ্রুপে শনিবার সকালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হওয়ার আগে হাইতিয়ান ফুটবল রূপকথার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন, ৩১ বছর বয়সী স্ট্রাইকার ফ্রান্টজডি পিয়েরোত স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শৈশবের ক্ষুধা, সহিংসতা আর রক্তভেজা এক সংগ্রামের গল্প শুনিয়েছেন। বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে কোটি কোটি টাকার গ্ল্যামারের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকলেও, পিয়েরোতের উঠে আসার গল্পটা কোনো হরর মুভির চেয়ে কম নয়। দারিদ্র আর সংগ্রামের চোখ ভেজা সব গল্প।

ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতির চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া পিয়েরোত বলেন, আমি এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছি যেখানে দিনের পর দিন আমাদের ঘরে কোনো খাবার থাকত না। খালি পেটে ঘুমাতে যাওয়াটাই ছিল নিয়ম। সেই শৈশবে ফুটবল খেলার জন্য তাঁদের কোনো বুট বা আসল ফুটবল ছিল না। পিয়েরোত স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা রাস্তায় খালি পায়ে ফুটবল খেলতাম। বল কেনার পয়সা ছিল না বলে আমরা ছোট ছোট কমলালেবু দিয়ে ফুটবল খেলতাম! প্রায়ই রাস্তার ভাঙা কাঁচের টুকরো আমাদের খালি পায়ে ঢুকে যেত। হাসপাতালে যাওয়ার মতো টাকা আমাদের পরিবারে ছিল না, তাই নিজেদের পায়ের কাঁচ আমাদের নিজেদেরই টেনে বের করতে হতো।

পিয়েরোত স্পষ্ট করেন, এই নির্মম চিত্র শুধু তাঁর একার নয়; রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চরম নিরাপত্তাহীন হাইতির হাজার হাজার শিশুর নিত্যদিনের বাস্তবতা এটি। তবে এই নরককুণ্ডের মাঝেও ফুটবল কীভাবে ম্যাজিকের মতো কাজ করে, তা জানিয়ে এই স্ট্রাইকার বলেন, বিশ্বকাপে আমাদের প্রথম ম্যাচের আগে পুরো দেশে একটাও গুলির শব্দ শোনা যায়নি, কোনো মারামারি হয়নি। কিচ্ছু না! চারদিকে শুধু ফুটবল আর ফুটবল। পুরো দেশ শুধু হাইতি জাতীয় দলের দিকে চোখ রেখেছিল।

Hatiti Stricker
পিয়েরোতের মতে, ৫২ বছর পর হাইতির এই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করাটা দেশের মানুষের কাছে শুধু বিনোদন নয়,একমাত্র বেঁচে থাকার আশা ও সুখের প্রতীক। নিজের এই অতীতকে ভুলে না গিয়ে তিনি দেশে একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছেন, যা শিশুদের শিক্ষা ও খেলাধুলার সুযোগ করে দেয়। দেশের ফুটবল পরিকাঠামোর করুণ দশা তুলে ধরে তিনি বলেন, হাইতিতে এমন কোচও আছেন যাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাঁরা কোচিং লাইসেন্স নেয়ার ফি দেবেন নাকি সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেবেন!

মাত্র ১১ বছর বয়সে পিয়েরোত হাইতি ছেড়ে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসে পাড়ি জমান। ফুটবলার হলেও বাবা-মায়ের কড়া শাসনে পড়াশোনাটা ফাঁকি দেননি তিনি। ইতিমধ্যেই তিনি অপরাধ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

আর পাঁচটা পেশাদার ফুটবলার যেখানে অবসরের পর কোচ বা ধারাভাষ্যকার হতে চান, পিয়েরোতের পরিকল্পনা সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চমকপ্রদ। তিনি ফুটবল ক্যারিয়ার শেষে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ে যোগ দিতে চান! কৌতুকী ছলে তিনি বলেন, আমার বাবা-মা সব সময় শিক্ষার ওপর জোর দিতেন। ফুটবল ক্যারিয়ার যে কোনো দিন শেষ হয়ে যেতে পারে। কাল যদি খুব মারাত্মক কিছু ঘটে যায়, তবে লোকে কাকে ডাকবে? এফবিআই-কে!

কমলালেবু লাথি মেরে, পায়ে কাঁচ ফুটিয়ে বড় হওয়া এই ক্ষ্যাপাটে স্ট্রাইকার মাঠের প্রেশারকে পাত্তাই দেন না। অনাহারে দিন কাটানো যে ছেলেটি কখনো বিশ্বাস হারায়নি, সে শনিবার বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্স মার্কিনহোস-গ্যাব্রিয়েলদের সামনে বুক চিতিয়ে লড়তে ভয় পাবে কেন? ব্রাজিলের বিশ্বসেরা তারকাদের বিরুদ্ধে পিয়েরোত ও তাঁর হাইতি কোনো নতুন রূপকথা লিখতে পারে কিনা, তা দেখতে ফুটবলপ্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন!