ইতিহাসের এক সোনালী দুয়ারে দাঁড়িয়ে স্কটল্যান্ড ফুটবল দল। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রথম জয় (হাইতির বিরুদ্ধে ১-০) তুলে নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে আছে তারা। এবার তাদের সামনে সুযোগ, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটের টিকিট কাটার।
ভোর ৪টায় ফক্সবরোর মাঠে বি-গ্রুপের ব্লকবাস্টার ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হবে স্টিভ ক্লার্কের শিষ্যরা। তবে স্কটিশদের এই স্বপ্নের পথটা মোটেও মসৃণ নয়; কারণ সামনে দাঁড়িয়ে ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট এবং বর্তমান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি মরক্কো, যারা প্রথম ম্যাচেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে।
স্কটিশ সমর্থকদের মনে অবশ্য ম্যাচটিকে ঘিরে অন্য এক আগুন জ্বলছে। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে এই মরক্কোর কাছেই ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিল স্কটল্যান্ড, যা আজও মরক্কোর বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়। ফক্সবরোর গ্যালারি কাঁপানো ‘টার্টান আর্মি’ (স্কটল্যান্ড সমর্থক) চাইবে সেই পুরোনো ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে প্রতিশোধের মহাকাব্য লিখতে।
প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে ইসমাইল সাইবারির গোলে মরক্কো যেভাবে সেলেসাও ডিফেন্সকে নাচিয়েছিল, তা দেখে স্কটিশ কোচ স্টিভ ক্লার্ক বেশ সতর্ক। চলতি বছরেই বেশ বিতর্কের মধ্য দিয়ে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপা জেতা মরক্কোকে নিয়ে ক্লার্ক বলেন, "বশ্বের শীর্ষ ১০-এর কোনো দলের বিরুদ্ধে খেলতে নামলে বল পায়ে এবং বল ছাড়া, দুই বিভাগেই আপনাকে অতিমানবীয় হতে হবে। আমরা এই কাজের কঠিন দিকগুলো সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানি। মরক্কো গত বিশ্বকাপে শেষ চারে খেলেছিল, আর আমার মনে হয় বর্তমান দলটা তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
একই সুরে সুর মিলিয়ে স্কটিশ অধিনায়ক অ্যান্ডি রবার্টসনও ইতিহাস গড়ার হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের দলের কোনো ছেলেই ইতিহাস গড়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। আমরা জানি আমরা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি দলের বিরুদ্ধে নামছি, কিন্তু আমরা যে কোনো দলের জন্যই ম্যাচটা নরক বানিয়ে দিতে পারি। নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে আশা করি আমরা ইতিহাস গড়েই মাঠ ছাড়ব।" স্কটল্যান্ড শিবিরে ডিফেন্ডার স্কট ম্যাককেনার কাফ ইনজুরি নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও, আশরাফ হাকিমিদের মরক্কো শিবিরে কোনো চোটের সমস্যা নেই।
মরক্কো দলটিতে এবার যোগ হয়েছে মারাত্মক কিছু ‘গোপন বারুদ’। মে মাসে ফরাসি অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়কত্ব ছেড়ে মরক্কোর জার্সিতে নাম লেখানো মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি মাঝমাঠের দখল নিতে প্রস্তুত। সাথে আছেন স্পেন ছেড়ে মরক্কোকে বেছে নেওয়া রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ব্রাহিম দিয়াজ, যিনি পাঁচ গোল করে আফ্রিকান কাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন।
রাইট-ব্যাক পজিশনে আছেন বর্তমান আফ্রিকান বর্ষসেরা ফুটবলার আশরাফ হাকিমি, যিনি ২০২২ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি (২৬টি) সফল ট্যাকল করে রেকর্ড গড়েছিলেন। স্কটল্যান্ডের ফরোয়ার্ড লাইনের জন্য হাকিমির এই রক্ষণ ভাঙা এক বিরাট পরীক্ষা।
১২ বারের ব্যর্থতা: ইউরো এবং বিশ্বকাপ মিলিয়ে নিজেদের আগের ১২টি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের প্রতিটিতেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে স্কটল্যান্ড। ভোরে জিতলে তারা প্রথমবার নকআউটে যাবে।
ম্যাকগিনের ম্যাজিক: স্কটিশ কোচ স্টিভ ক্লার্কের অধীনে খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ ২১টি গোল করে কিংবদন্তি ডেনিস ল-এর রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন জন ম্যাকগিন। আজ তাঁর পা থেকে আরেকটি গোল ইতিহাস লিখে দিতে পারে।
ইউরোপের যম মরক্কো: মরক্কোর খেলা শেষ ১২টি বিশ্বকাপ ম্যাচের ৯টিই ছিল ইউরোপীয় দলগুলোর বিরুদ্ধে। ইউরোপের বিরুদ্ধে শেষ ৬টি গ্রুপ পর্বের ম্যাচের মাত্র একটিতে হেরেছে তারা (২০১৮ সালে পর্তুগালের কাছে)।
অপরাজিত আফ্রিকান রেকর্ড: বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ৫টি গ্রুপ পর্বের ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে মরক্কো। ভোরে স্কটল্যান্ডকে রুখে দিতে পারলে ক্যামেরুন ও সেনেগালের পর তৃতীয় আফ্রিকান দেশ হিসেবে টানা ৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়বে তারা।
ফক্সবরোর চেনা কন্ডিশনে স্কটল্যান্ড টানা দ্বিতীয় ম্যাচের জন্য গ্যালারিতে বিপুল সমর্থন পেলেও, মরক্কোর এই নিখুঁত ও গতিশীল ফুটবলের সামনে স্কটিশদের মাটিতে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি দেখছেন ফুটবল পণ্ডিতরা। অনেকেই ম্যাচটিতে মরক্কোর ২-১ গোলের জয় দেখছেন। এখন দেখার বিষয়, ক্লার্কের স্কটিশ গেমাররা এই হিসাব উল্টে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে পারে কিনা!