আসছে বুধবার ৩৯ বছরে পা দিতে যাচ্ছেন বিশ্বফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা লিওনেল মেসি। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপটিই হতে পারে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। মাঠের সবুজ গালিচায় কোটি কোটি ভক্তকে বুঁদ করে রাখা এই আর্জেন্টাইন জাদুকরের মাঠের বাইরের জীবনটা কিন্তু এক্কেবারে উল্টো। বয়স যত বাড়ছে, স্পটলাইটের চাকচিক্য থেকে নিজেকে ততটাই দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন তিনি। প্রতি বছরের মতো এবারও নিজের ৩৯তম জন্মদিনটি কোনো জাঁকজমক বা বিলাসী আয়োজন ছাড়া, শুধু পরিবার আর কাছের বন্ধুদের সাথে নিভৃতে কাটানোর এক অপরিবর্তিত অভ্যাস বজায় রাখছেন মেসি।
গত কয়েক বছর ধরেই মেসির জন্মদিনের স্ক্রিপ্টটা প্রায় একই রকম। ২০২৩ সালে যখন তিনি ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেয়ার মতো জীবনবদলকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তখন ৩৬তম জন্মদিনটি উদযাপিত হয়েছিল পুরোপুরি ব্যক্তিগত স্তরে। ২০১৭ সালে বিয়ে করা তাঁর স্ত্রী তথা জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার আন্তোনেলা রোকুজ্জোর শেয়ার করা দু-একটি পারিবারিক ছবি ছাড়া ভক্তরা কিছুই জানতে পারেননি।
পরের বছর ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা চলাকালীন ঘরের বাইরে নিজের ৩৭তম জন্মদিন কাটান মেসি। সেবারও আন্তোনেলা ইনস্টাগ্রামে একটি সাধারণ অথচ আবেগঘন বার্তার সাথে একটিমাত্র ফ্যামিলি ফটো পোস্ট করেছিলেন; কোনো লাইভ স্ট্রিম, ভিডিও বা আভিজাত্যের প্রদর্শন ছিল না। আর গত বছর ২০২৫-এ ৩৮তম জন্মদিনে তো আরও এক ধাপ এগিয়ে! স্মার্ফস কার্টুনের খিটখিটে স্বভাবের চরিত্র ‘গ্রাউচি’-এর থিম দিয়ে তৈরি একটি কেক কেটেছিলেন মেসি, যা নিয়ে ক্যাপশনে তাঁর রসিক স্ত্রী স্বামীকে নিয়ে মজাও করেছিলেন, প্রচারবিমুখ এক ফ্যামিলি ম্যান!
সোশ্যাল মিডিয়ায় কোটি কোটি ফলোয়ার, কিন্তু আড়ালে জীবন: মাঠের বাইরে শৈশবের শহর রোজারিওর সেই লাজুক ছেলেই রয়ে গেছেন মেসি। ২০১৬ সালে ইমেজ রাইটস নিয়ে ট্যাক্স ফাঁকির মামলায় বাবা হরহে মেসির সাথে দোষী সাব্যস্ত হয়ে স্প্যানিশ সরকারকে বড় অঙ্কের জরিমানা দেওয়ার ঘটনাটি ছাড়া মেসির ক্যারিয়ারে তেমন কোনো বড় বিতর্ক নেই। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যেখানে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোকে ট্রেইনিং, লাইফস্টাইল আর পার্সোনাল ব্র্যান্ডের শো-অফ দিয়ে জমিয়ে রাখেন, মেসি সেখানে চরম হিসেবি। খুব কম পোস্ট করেন, সাক্ষাৎকার দেন না বললেই চলে। অথচ ইনস্টাগ্রামে রোনালদোর পরেই ৫০ কোটি ৮ লক্ষেরও বেশি ফলোয়ার নিয়ে দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে আছেন মেসি।
মেসির এই প্রোফাইলের সিংহভাগই স্পন্সরশিপ এবং বিজ্ঞাপনী প্রচারণায় ঠাসা। ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটের হিসাব অনুযায়ী, মেসির মাত্র একটি স্পনসরড পোস্টের মূল্য প্রায় ২.৫ থেকে ২.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩০ কোটি টাকারও বেশি!)। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, গত ১২ মাসে বিজ্ঞাপনী চুক্তি, স্পন্সরশিপ ও অন্যান্য ব্যবসা থেকে মাঠের বাইরেই মেসি আয় করেছেন প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার। এত বিপুল প্রতিপত্তির পরও মেসির ব্যক্তিগত জীবনের আসল রূপ দেখতে হলে ভক্তদের উঁকি দিতে হয় স্ত্রী আন্তোনেলার প্রোফাইলে। আন্তোনেলাই যেন ভক্তদের সাথে মেসির চেনা চাতুর্যের এক অদৃশ্য সেতু!
প্যারিসের ‘কষ্ট’ ভুলে মিয়ামির খোলা হাওয়া: ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্যারিস সেন্ট জার্মেইনে কাটানো সময়টা ছিল মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়। বার্সেলোনা ছাড়ার ট্রমা, ফ্রান্সের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে না পারা, আর পিএসজি সমর্থকদের একাংশের চরম ঠান্ডা আচরণ মেসিকে ম্যাচগুলোতে গম্ভীর ও বিষণ্ণ করে রেখেছিল। তবে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মিয়ামিতে আসার পর এক আমূল পরিবর্তন দেখা গেছে। স্ত্রী এবং তিন সন্তান, ১৩ বছর বয়সী থিয়াগো, ১০ বছরের মাতেও এবং ৮ বছরের চিরোকে নিয়ে এখন হাসিখুশি ও রিল্যাক্সড মুডে বোট রাইড, ডিনার বা পুলের পাশে অলস সময় কাটাতে দেখা যায় মেসিকে। প্যারিসের সেই বন্দিদশা থেকে মিয়ামির মুক্ত বাতাসে মেসি যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া সুখ খুঁজে পেয়েছেন।
মাঠের সাফল্য বনাম মাঠের বাইরের কান্না: গত ১২ মাস মেসির জন্য একদিকে যেমন ছিল অর্জনে ঠাসা, অন্যদিকে ছিল চরম উদ্বেগের। ইন্টার মিয়ামির হয়ে এমএলএস কাপ জেতা এবং লিগের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার আনন্দে যখন তিনি ভাসছিলেন, ঠিক তখনই গত ডিসেম্বরে মিয়ামিতে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন তাঁর ছোট বোন মারিয়া সল মেসি। শরীর পুড়ে যাওয়া এবং একাধিক হাড় ভাঙার কারণে দীর্ঘ পুনর্বাসনে পুরো পরিবারকে লড়তে হয়েছে।
এর পাশাপাশি বর্তমানে বাবা হরহে মেসির অসুস্থতা নিয়েও চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে আছেন ফুটবল জাদুকর। গত মঙ্গলবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার পর মাঠে মেসিকে চোখের জল মুছতে দেখা গিয়েছিল। পরে জানা যায়, বাবার গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে এবং চিকিৎসকদের কড়া তত্ত্বাবধানে থাকার কারণেই আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। বার্সেলোনার সেই বিদায় না বলতে পারার আফসোস আর পিএসজির তিক্ততা কাটিয়ে ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি এখন অনেক বেশি পরিণত ও শান্ত। কোটি কোটি ডলারের বিজ্ঞাপনী মুখ হলেও, মেসির জীবনের ধ্রুবতারা আজও সেই একটাই, পরিবার, অতি সাধারণ জীবন এবং স্পটলাইটের আড়ালে থাকা এক টুকরো শান্তি।
তথ্যসূত্র: গ্লোবো স্পোটর্স