মহানাটকীয় ড্রয়ে নকআউটে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া, বিদায় ইরান

ম্যাচ শুরুর আগেই ফুটবলপ্রেমীরা এর নানা নাম দিয়ে ফেলেছিলেন। কেউ বলছিলেন ইতালীয় ক্লাসিক ‘টেলটেল বিস্কোত্তো’, আবার কেউ বলছিলেন ১৯৮২ বিশ্বকাপের সেই কুখ্যাত ‘ডিসগ্রেস অব ভিহন’ ম্যাচের আধুনিক সংস্করণ ‘ডিসগ্রেস অব কানসাস সিটি’। সেবার পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ১-০ গোলের সুবিধাবাদী ম্যাচে কপাল পুড়েছিলো আলজেরিয়ার।

তবে ৪৪ বছর পর এবার আমেরিকার কানসাস সিটিতে ইতিহাস ফিরলো ভিন্নরূপে। এবার অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার ৩-৩ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর ড্রয়ে কপাল পুড়ল ইরানের। শেষ মুহূর্তের মহানাটকীয়তায় ম্যাচটি ড্র হওয়ায় অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া—উভয় দলই পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে, আর টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়েছে ইরানের।

ফিফার ৪৮ দলের নতুন নিয়মের মারপ্যাঁচে এই ম্যাচে ইরান চেয়েছিলো যেকোনো এক দল জিতুক। কারণ, কোনো এক দল জিতলেই কেবল তৃতীয় স্থানাধিকারী দল হিসেবে পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ থাকতো ইরানের। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে রিয়াদ মাহরেজের গোলে আলজেরিয়া যখন ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায়, ইরান তখন নকআউটের স্বপ্ন দেখছিলো। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে সাশা কালাইদজিচের অবিশ্বাস্য হেডারে অস্ট্রিয়া সমতায় ফিরলে মুহূর্তে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক ম্যাচ শেষে বলেন, শেষ ১২০ সেকেন্ডে যা ঘটেছে, তা আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। এমন নাটকীয় মোড় নেওয়া ম্যাচ আমি ক্যারিয়ারে কখনো দেখিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটির স্থানীয় সময় রাত ৯টায় খেলা শুরু হলেও গ্যালারির তীব্র আর্দ্রতা খেলোয়াড়দের বেশ ক্লান্ত করে তুলছিলো। ৬৯ হাজার ৪৫ জন দর্শকের ঠাসা গ্যালারির সিংহভাগই অবশ্য সমর্থন দিচ্ছিল আলজেরিয়াকে।

ম্যাচের ২৮তম মিনিটে ডেভিড আলাবার চমৎকার এক পাস থেকে অস্ট্রিয়াকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন ৩৭ বছর বয়সী স্ট্রাইকার মার্কো আর্নাউতোভিচ। গোল খাওয়ার পর রক্ষণভাগ ভেঙে পাল্টা আক্রমণে যায় আলজেরিয়া। ম্যাচের প্রথমার্ধের শেষ দিকে ফিলিপ মওয়েনে ডি-বক্সের ভেতর রিয়াদ মাহরেজকে ফাউল করলেও রেফারি প্লে-অন সুবিধা দেন। সেই সুযোগে আলগা বল ধরে দূরের পোস্টে জোরালো শটে আলজেরিয়াকে ১-১ সমতায় ফেরান রফিক বেলঘালি।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তিন পরিবর্তন এনে অস্ট্রিয়া আক্রমণের ধার বাড়ায়। ৫৫তম মিনিটে কনরাড লাইমারের দুর্দান্ত কাটব্যাক থেকে মার্সেল সাবিৎজার গোল করে অস্ট্রিয়াকে আবার এগিয়ে নেন (২-১)। কিন্তু এর মাত্র পাঁচ মিনিট পরেই (৬০ মিনিটে) সমতা ফেরায় আলজেরিয়া। হুসেম আওআরের চমৎকার পাস থেকে বল জালে জড়ান আলজেরিয়ান কিংবদন্তি রিয়াদ মাহরেজ (২-২)।

চার গোল হওয়ার পর হঠাৎ করেই ম্যাচের গতি কমে যায়। দুই দলই আক্রমণ করা কমিয়ে দিয়ে নিজেদের মধ্যে ব্যাকপাস খেলতে শুরু করে। একপর্যায়ে আলজেরিয়া টানা পাঁচ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড নিজেদের মধ্যে কোনো আক্রমণ ছাড়াই ১০৯টি ছোট ছোট পাস খেলে। গ্যালারি থেকে তখন দুয়ো ধ্বনিও আসছিল। ম্যাচ শেষে আলজেরিয়ার ম্যানেজার ভ্লাদিমির পেতকোভিচ স্বীকার করেন, প্রায় ১৫ মিনিট দুই দলই কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিলো, তবে তা কোনো পাতানো পরিকল্পনা ছিলো না। আমরা আসলে প্রতিপক্ষকে পরখ করছিলাম।

ম্যাচের ৯০ মিনিট পার হওয়ার পর আসল নাটকের শুরু হয়। অতিরিক্ত সময়ে ৩৫ বছর বয়সী রিয়াদ মাহরেজ নিজের দ্বিতীয় গোল করে আলজেরিয়াকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। আলজেরিয়ার সমর্থকরা যখন উল্লাসে ফেটে পড়ছেন এবং ইরান যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, ঠিক তখনই আসে অস্ট্রিয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

অতিরিক্ত সময়ের ঠিক শেষ মুহূর্তে বদলি খেলোয়াড় সাশা কালাইদজিচ এক মরিয়া হেডে বল আলজেরিয়ার জালে জড়ান (৩-৩)। এই এক গোলেই নিশ্চিত হয়ে যায় অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া দুই দলেরই শেষ ষোলোর টিকিট।

এই ড্রয়ের ফলে ১৯৮২ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বে পা রাখলো অস্ট্রিয়া। অন্যদিকে ২০১৪ সালের পর আবার নকআউট পর্বে উঠলো আলজেরিয়া। আর কানসাস সিটির এই ‘মিসৌরি কম্প্রোমাইজ’ ম্যাচের পর টিহুয়ানার হোটেলে বসে থাকা ইরানি শিবিরে নেমে আসে কান্নার রোল।