ইতিহাস গড়ার মঞ্চে মুখোমুখি কানাডা-দক্ষিণ আফ্রিকা

রাতেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের চলতি আসরের মূল লড়াই, হয় বাঁচা না হয় মরণ। মাঠের খেলাই হোক আরম, ট্রাইব্রেকারই হোক, শেষ পর্যন্ত গোলের ফয়সালাতেই নির্ধারিত হবে দলগুলো ভাগ্য। আর এই  নকআউট পর্ব তথা শেষ ৩২-এর উদ্বোধনী রাত ১টায় লস অ্যাঞ্জেলেসে মুখোমুখি হচ্ছে টুর্নামেন্টের অন্যতম সহ-আয়োজক কানাডা এবং আফ্রিকান পরাশক্তি দক্ষিণ আফ্রিকা। এই ম্যাচটি যে ফলেই শেষ হোক না কেন, ফুটবল বিশ্বকাপে এক নতুন ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে। কারণ, নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার গৌরব দুই দলের সামনেই।

গ্রুপ পর্বে কাতারের বিরুদ্ধে ৬-০ ব্যবধানের এক মহাকাব্যিক জয় পেয়েছিল কানাডা, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে কনকাকাফ অঞ্চলের কোনো দেশের সবচেয়ে বড় জয়। সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের স্যার জিওফ হার্স্টের পর প্রথম কোনো আয়োজক দেশের ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়েন কানাডিয়ান তারকা জোনাথন ডেভিড। দুর্দান্ত এই গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্সের কারণে আজকের ম্যাচে কানাডাকেই সামান্য এগিয়ে রাখছেন বিশেষজ্ঞরা।

Canada Team 02
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সুইসদের কাছে ২-১ গোলে হেরে যাওয়ায় গ্রুপ সেরা হতে পারেনি কানাডা। রানার্স আপ হওয়ার খেসারত হিসেবে নিজেদের মাঠের সুবিধা হারিয়েছে। এর ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম কোনো আয়োজক দেশ হিসেবে নিজ সীমান্তের বাইরে নকআউট পর্বের ম্যাচ খেলতে হচ্ছে কানাডাকে।

তবে দলের মার্কিন কোচ জেসি মার্শ মনে করছেন, দেশের বাইরে খেলাটি তাঁর দলের জন্য শাঁখে করাত না হয়ে বরং আশীর্বাদ হতে পারে। মার্শ বলেন, অবশ্যই আমরা কানাডায় আমাদের নিজেদের দর্শকদের সামনে খেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দেশের মাটিতে খেলার একটা বিশাল মানসিক চাপও থাকে। হোটেলের চারপাশে মানুষের ভিড়, শহরের আবহ, সব মিলিয়ে একটা সার্কাসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাইরে খেলতে আসায় দল কিছুটা শান্ত পরিবেশ পাবে এবং পুরো মনোযোগ শুধু ম্যাচের ওপর ধরে রাখতে পারবে, যা আমাদের জন্য ভালোই হবে।

Canada Team 01
কানাডা শিবিরের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো, বায়ার্ন মিউনিখ তারকা ও দলের প্রধান চালিকাশক্তি আলফোনসো ডেভিস চলতি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলতে মাঠে নামতে পারেন। পিএসজি’র বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়া ২৫ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারকে গ্রুপ পর্বে খেলানো হয়নি। সুইজারল্যান্ড ম্যাচের আগে ডেভিসকে দলে রাখার নাটকীয়তা নিয়ে মার্শ হেসে বলেন, সুইজারল্যান্ড ম্যাচের দিন ডেভিসের খেলার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। আমি শুধু চেয়েছিলাম সুইজারল্যান্ড যেন ওকে নিয়ে বাড়তি চিন্তা করে একটু চাপে থাকে। এই ম্যাচে হয়তো শুরুর একাদশে না হলেও বদলি হিসেবে মাঠ কাঁপাতে পারেন ডেভিস।

অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার রূপকথাও কম রোমাঞ্চকর নয়। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই ২ জন লাল কার্ড পেয়ে ৯ জনের দলে পরিণত হওয়া এবং ম্যাচ হেরে বিদায়ের মুখে পড়া ‘বাফানা বাফানা’রা অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘এ’-র রানার্সআপ হয়ে তারা নকআউটে এসেছে। মজার ব্যাপার হলো, পুরো টুর্নামেন্টে দক্ষিণ আফ্রিকা মাত্র ৩০ মিনিটের মতো সময় লিড বা এগিয়ে ছিল, বাকি সময় তারা লড়াই করেই টিকে রয়েছে।

কানাডা কোচ জেসি মার্শও প্রতিপক্ষকে সমীহ করে বলেছেন, সবাই ভেবেছিল দক্ষিণ কোরিয়া ওই ম্যাচ জিতবে, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা মাঠে দাপট দেখিয়েছে। ওরা শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অ্যাথলেটিক। ওরা আমাদের কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। দক্ষিণ আফ্রিকার ৭৪ বছর বয়সী কোচ হুগো ব্রুস কোরিয়ার বিপক্ষে জিতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে ম্যাচ জয়ের এক অনন্য বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। দলের এই অবিশ্বাস্য মানসিকতার প্রশংসা করেছেন ব্রুসও।

South Africa 01
রাতের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে ফিরছেন নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ওঠা তেবোহো মকোয়েনা। তবে মেক্সিকো ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়া থেম্বা জোয়ানে আজকেও মাঠের বাইরে থাকবেন। অন্যদিকে, কানাডা শিবিরে ইনজুরির ধাক্কা রয়েছে; কাতার ম্যাচে টিবিয়া ফ্র্যাকচারের শিকার হওয়া ইসমায়েল কোনে আজ থাকছেন না। এছাড়া স্টিফেন ইউস্তাকিও এবং আলফি জোন্সের খেলা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তবে আক্রমণভাগে জোনাথন ডেভিড এবং কাইল লারিন জুটিই আজ কানাডার প্রধান ভরসা।

পরিসংখ্যান বলছে, এর আগে ২০০৭ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা ২-০ গোলে জিতেছিল। বিশ্বকাপে এটিই তাদের প্রথম দেখা। লস অ্যাঞ্জেলেসের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে যে দল জিতবে, শেষ ১৬ বা রাউন্ড অব ১৬-এর টিকিট কেটে তারা মুখোমুখি হবে নেদারল্যান্ডস অথবা মরক্কোর। দুই দেশের ইতিহাস গড়ার এই লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে, তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব!