উৎসব আর কাজের বাইরে ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতির যে দুটি জিনিস রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে, তা হলো, উন্মাদনা আর গভীর বিশ্বাস। আর, এই দুইয়ের মেলবন্ধন যখন ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে এক হয়, তখন ব্রাজিলের সেলেসাওরা যেন হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। বিশেষ করে জুন মাসের ঐতিহ্যবাহী উৎসব বা 'জুন ফেস্টিভ্যাল'-এর সময়, যখন পুরো ব্রাজিল মেতে ওঠে তিন পবিত্রময় সাধু- সেন্ট অ্যান্থনি, সেন্ট জন এবং সেন্ট পিটার (সাঁও পেদ্রো)-এর বন্দনায়।
ফুটবল ও এই তিন সাধুর আশীর্বাদের এক অদ্ভুত ও সফল সমীকরণ প্রকাশ করেছে ব্রাজিলের বিখ্যাত জরিপ সংস্থা ‘গাতো মেস্ত্রে’। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই তিন সাধুর পুণ্যতিথিতে বা উৎসবের দিনে ব্রাজিল এ পর্যন্ত ১২টি ম্যাচ খেলেছে, যার মধ্যে ৯টিতেই জয় পেয়েছে সেলেসাওরা, ড্র করেছে ২টি আর হারের মুখ দেখেছে মাত্র ১টি ম্যাচে!
এই অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য রেকর্ড বুক পকেটে নিয়ে সোমবার রাতে মেক্সিকো-আমেরিকা বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট ম্যাচে এশিয়ার পরাশক্তি জাপানের মুখোমুখি হচ্ছে হেক্সা মিশনের খোঁজে থাকা সেলেসাওরা। কাকতালীয়ভাবে, সোমবারই ব্রাজিলে উদযাপিত হতে যাচ্ছে সাধু সেন্ট পিটার বা ‘সাঁও পেদ্রো’র উৎসব।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেন্ট পিটারের দিনে ব্রাজিল সর্বশেষ ম্যাচ খেলেছিল আজ থেকে ঠিক ৬৮ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে। সেদিন সুইডেনের মাটিতে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হয়েছিল সেলেসাওরা। ফুটবল সম্রাট পেলে এবং ভাভার জোড়া গোল এবং জাগালোর এক গোলের ওপর ভর করে সুইডেনকে ৫-২ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল ব্রাজিল।
দীর্ঘ ৬৮ বছর পর আবারও সেই সেন্ট পিটারের পুণ্যতিথিতে নকআউট ম্যাচ খেলতে নামছে ব্রাজিল। অতীতের সেই ৫-২ গোলের সোনালী স্মৃতি আর সেন্ট পিটারের আশীর্বাদ কি কাল হিউস্টনের মাঠে জাপানকে উড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে? ভক্তদের মনে এখন সেই আশারই গুঞ্জন।
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপেই ইতিমধ্যেই বাকি দুই সাধুর দিনে মাঠে নেমে অপরাজিত থাকার ধারা বজায় রেখেছে কার্লো আনচেলত্তির দল। গত ১৩ জুন সেন্ট অ্যান্থনির দিনে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সাথে ১-১ গোলে ড্র করেছিল ব্রাজিল, যেখানে গোল করেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
অতীতের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই সেন্ট অ্যান্থনির দিনে ব্রাজিল ৫ ম্যাচ খেলে ৩টি জিতেছে ও ২টি ড্র করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০০২ সালের সেই বিখ্যাত বিশ্বকাপ অভিযান, যেখানে কোস্টা রিকাকে ৫-২ গোলে হারিয়েছিল রোনালদো-রিভালদোরা।
অন্যদিকে, গত ২৪ জুন ছিল সেন্ট জন বা ‘সাঁও জোয়াও’র দিন। সেই উৎসবের দিনে চলতি বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেয় ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুসের জোড়া গোল আর মাথেউস কুনহার গোল সাম্বা ম্যাজিক দেখায় গ্যালারিতে।
তবে সেন্ট জনের এই দিনটি ব্রাজিলের ইতিহাসে একমাত্র কালো দাগ হয়ে আছে, কারণ ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র ম্যাচে এই ২৪ জুনেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। তা ছাড়া বাকি ৫টি ম্যাচেই জয় এসেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১৯৫০, ১৯৭৮ ও ১৯৯৪ সালের দাপুটে জয়গুলো।
তিন সাধুর উৎসবের দিনে ব্রাজিলের হয়ে গোল করার দিক থেকে ৫টি করে গোল নিয়ে সবার ওপরে আছেন ফুটবল সম্রাট পেলে এবং কিংবদন্তি ভাভা। তবে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সবাইকে চমকে দিয়ে মাত্র ১টি বিশ্বকাপ আসরেই (চলতি ২০২৬ আসরে) ৩টি গোল করে তাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন পোস্টার বয় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এছাড়া গ্যারিঞ্চা, রোনালদো নাজারিও এবং আদেমির করেছেন ২টি করে গোল। কাকা, রিভালদো এবং জাগালোর মতো ১৪ জন মহাতারকার পাশে এই তালিকায় নাম লিখিয়েছেন বর্তমান ফরোয়ার্ড মাথেউস কুনহাও।
স্কটল্যান্ড ম্যাচের পর গ্লোবো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই কুনহাই ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমের এক মজাদার ও ঝাঁঝালো গল্প ফাঁস করেছেন। ব্রাজিলের পারাইবা অঞ্চলে জন্ম নেয়া কুনহা হাসতে হাসতে বলেন, স্কটল্যান্ডকে হারানোর পর দলের ভেতরে ব্রাজিলের দুই বিখ্যাত সেন্ট জন উৎসব, পারাইবার ‘কাম্পিনা গ্রান্দে’ এবং পারনামবুকোর ‘কারুয়ারু’র মধ্যে কোনটি সেরা, তা নিয়ে সতীর্থদের সাথে তাঁর এক ঐতিহাসিক ও রসালো বিতর্ক জমে উঠেছিল!
চলতি বিশ্বকাপে তিন সাধুর উৎসবের দিনগুলোতে এখন পর্যন্ত শতভাগ অপরাজিত ব্রাজিল। সোমবার রাত ১১টায় হিউস্টনের মাঠে জাপানের জমাট ডিফেন্স ভেঙে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটতে এবং সাধু পিটারের সেই ৬৮ বছরের পুরোনো রূপকথা পুনরুজ্জীবিত করতে ভিনিসিয়ুস-কুনহারা সম্পূর্ণ তৈরি, এখন শুধু মাঠের লড়াইয়ের অপেক্ষা!