ধর্ষণে অভিযুক্ত পাঁচ তারকাকে নিয়ে বিশ্বকাপে তোলপাড়!

এবারের বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের হাইভোল্টেজ ম্যাচে রাতে যখন ব্রাজিল ও জাপান মুখোমুখি হচ্ছে, তখন মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এক চরম বিতর্ক বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অন্তত পাঁচ জন ফুটবলারের বিরুদ্ধে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে গুরুতর ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাওয়া জাপান দলেরই দুই তারকা! কিন্তু এত বড় অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা কেন তাদের এই মহাযজ্ঞে খেলার অনুমতি দিল?

ফিফার নীতি অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের অভিযোগ থাকলে বা মামলা চললেও তাকে আসরে নিবন্ধন করতে বাধা দেয়ার কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। ফিফা বরাবরই দেশের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থার প্রতি সম্মান দেখানোর এবং দল গঠনের সিদ্ধান্ত জাতীয় ফেডারেশনের ওপর ছেড়ে দেয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। যতক্ষণ না ফিফা নিজে কোনো নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে বা আদালত খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের খেলতে কোনো বাধা থাকে না। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের তদন্ত ও আইনি মারপ্যাঁচে জড়িয়ে পড়া সেই পাঁচ ফুটবলারের হাঁড়ির খবর নিচে দেয়া হলো:
২০২৪ সালে জাপানের জুনিয়া ইতো দুই নারীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত হন ছবি: সংগৃহীত

জুনিয়া ইতো ও কাইশু সানো (জাপান): রাতে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মাঠে নামার অপেক্ষায় থাকা জাপানের আক্রমণভাগের অন্যতম অস্ত্র জুনিয়া ইতো ২০২৪ সালের শুরুতে এক বড় কেলেঙ্কারিতে জড়ান। ওসাকার একটি হোটেলে মদ্যপ অবস্থায় দুই নারীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলে তাকে তৎকালীন এশিয়ান কাপের দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে প্রসিকিউটররা এই মামলা থেকে ইতোকে খালাস দেন এবং এরপরই তিনি দলে ফেরেন।

এক নারীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে টোকিও পুলিশ জাপানের কাইশু সানোকে গ্রেপ্তার করেছিলো ছবি: সংগৃহীত
অন্যদিকে, জাপানের মিডফিল্ডার কাইশু সানো ২০২৪ সালের জুলাইয়ে টোকিওর এক হোটেলে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে সরাসরি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে তিনি কোনো শাস্তি ছাড়াই মুক্তি পান এবং ২০২৫ সালে জনসমক্ষে ক্ষমা চেয়ে ফুটবল ক্যারিয়ারে ফেরেন। জাপানি কোচ হাজিমে মোরিয়াসু তাঁর দলে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বলেন, ওকে ব্যক্তিগতভাবে ডাকার পর আমি ওর অনুশোচনা বুঝতে পেরেছি। একটা ভুলের জন্য কাউকে সমাজ বা ফুটবল থেকে একেবারে ছুড়ে ফেলা ঠিক নয়।

২০২৩ সালে ফ্রান্সে মরক্কোর হাকিমির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছিলেন ২৪ বছর বয়সী এক নারী ছবি: সংগৃহীত
আশরাফ হাকিমি (মরক্কো):
মরক্কোর ফুটবলের পোস্টার বয় এবং পিএসজি তারকা আশরাফ হাকিমি ২০২৩ সালে ফ্রান্সে এক ২৪ বছর বয়সী তরুণীকে নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হন। হাকিমি এই মামলা খারিজের আপিল করলেও ভার্সাই আদালত তা প্রত্যাখ্যান করেছে, যার ফলে ফরাসি আদালতে তাঁকে আনুষ্ঠানিক কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। হাকিমি অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে লিখেছেন, আজকাল শুধু অভিযোগই বিচারের জন্য যথেষ্ট, যা অন্যায়। আমি শান্তভাবে ট্রায়ালের অপেক্ষায় আছি, যেখানে সত্য উন্মোচিত হবে।

সাতটি ধর্ষণের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন ঘানার টমাস পার্টি ছবি: সংগৃহীত
থমাস পার্টি (ঘানা):
ঘানার তারকা মিডফিল্ডার থমাস পার্টির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে সাত-সাতটি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। আর্সেনালে খেলার সময় ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দুই নারী তাঁর বিরুদ্ধে ৫ বার এবং চলতি বছরের শুরুতে আরও দুই নারী তাঁর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তোলেন। ২০২৫ সালে তিনি গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান। এই তদন্তের জের ধরেই কানাডীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে পানামার বিপক্ষে তিনি মাঠে নামতে পারেননি। ঘানার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘অন্যায্য’ বললেও আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পার্টি এখনো ভুক্তভোগীদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন না।

একজন ব্রাজিলীয় নারীর করা ধর্ষণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেসের বিরুদ্ধে নিউজিল্যান্ড পুলিশ তদন্ত করছে ছবি: সংগৃহীত
রায়ান মেন্দেস (কেপ ভার্দে):
কেপ ভার্দে জাতীয় দলের অধিনায়ক রায়ান মেন্দেসের বিরুদ্ধে এক ব্রাজিলিয়ান নারী ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন। ওশেনিয়া অঞ্চলে প্রীতি ম্যাচ খেলতে গিয়ে একটি হোটেলে এই ঘটনা ঘটে বলে গত এপ্রিল থেকে নিউজিল্যান্ড পুলিশ এর তদন্ত করছে।

ইতিমধ্যেই পুলিশ হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ ও ভুক্তভোগীর মেডিকেল রিপোর্ট সংগ্রহ করেছে। নিউজিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী এই অপরাধ প্রমাণিত হলে ২০ বছরের জেল হতে পারে। এই বিষয়ে ফিফা জানিয়েছে যে, তারা নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখছে, তবে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্তাধীন বিষয়ে তারা এখনই চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করবে না।

মাঠের লড়াইয়ে ফুটবলাররা কোটি ভক্তের অনুপ্রেরণা হলেও পর্দার পেছনের এমন অন্ধকার অধ্যায় বিশ্বকাপের মতো পবিত্র মঞ্চের গায়ে এক বড় কলঙ্ক লেপে দিয়েছে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন চলছে তুমুল সমালোচনা!