২০১৪ সালের সেই ঐতিহাসিক মারাকানা ফাইনালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে পা রাখছে জার্মানি। মাঝে দীর্ঘ এক যুগ কেটে গেছে গ্রুপ পর্বের ব্যর্থতার চোরাবালিতে। অবশেষে সেই গেরো ছুটেছে। তবে এবারের শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে বোস্টনের মাঠে নামার আগে জুলিয়ান নাগেলসম্যানের ‘ডাই মানশাফট’ যেমন নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছে, তেমনই রেখে গেছে কিছু মারাত্মক দুর্বলতার ছাপ। রাত আড়াইয় তাদের প্রতিপক্ষ লাতিন আমেরিকার লড়াকু দল প্যারাগুয়ে।
খাতায়-কলমে জার্মানি ফেভারিট হলেও গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের কাছে হার তাদের রক্ষণভাগের কঙ্কালটা বের করে দিয়েছে। এর আগে অবশ্য কুরাসাওকে ৭-১ গোলে গুঁড়িয়ে এবং আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে টুর্নামেন্টের হেভিওয়েট হিসেবেই শুরু করেছিল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণভাগ বা ‘লো ব্লক’ ভাঙতে নাগেলসম্যান মূলত চেয়ে থাকবেন দুই তরুণ তুর্কি জামাল মুসিয়ালা এবং ফ্লোরিয়ান উইর্টজের জাদুকরী ক্রিয়েটিভিটির ওপর।
বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাটে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েও প্রতিপক্ষ কে হচ্ছে তা জানতে দেরি হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জার্মান বস নাগেলসম্যান। শনিবারের রাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে ক্ষুব্ধ এই কোচ বলেন, “গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে মনে হচ্ছে আমরা একধরণের শাস্তি পেলাম! আমরা সম্ভাব্য প্রতিপক্ষদের ভাগ করে নিয়েছিলাম। আমি নিজে ৩-৪টি ম্যাচ দেখেছি, অ্যানালাইসিস টিমও কাজ করেছে। সবাই বোঝেন, শনিবারের রাত কাটানোর জন্য এর চেয়ে ভালো অনেক উপায় ছিল। এটি ছিল একটি ‘অল-নাইটার’ (রাতভর কাজ)। আমরা ম্যাচের একটা বড় অংশ আগেই গুছিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম, যেন রোববারের দিন তাড়াহুড়ো করে ম্যাচ প্ল্যান বানাতে না হয়। আমরা সামলে নিয়েছি, আমাদের কোচিং স্টাফের সবাই এখনো তরুণ, তাই দরকারে পুরো রাত জেগে কাজ করার শক্তি আমাদের আছে।
গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে জার্মানি শিবিরে বড় এক ধাক্কা লেগেছে। গোড়ালির গুরুতর ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছেন ডিফেন্ডার নিকো শ্লটারবেক। তবে স্বস্তির খবর, ফুলব্যাক ন্যাথানিয়েল ব্রাউন ইনজুরি কাটিয়ে আজ একাদশে ফিরতে পারেন। অন্যদিকে, প্যারাগুয়ে শিবিরে মাঝমাঠের চালিকাশক্তি ডিয়েগো গোমেজ কার্ড সমস্যার কারণে নিষিদ্ধ থাকলেও, নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দলে ফিরছেন নিউক্যাসলের সাবেক তারকা মিগুয়েল আলমিরন।
যদি ম্যানুয়েল ন্যুয়ের মাঠে নামেন, তবে তিনি গড়বেন এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড। জার্মানির জার্সিতে বিশ্বকাপে এটি হবে তাঁর ২৩তম ম্যাচ। এর মাধ্যমে তিনি কিংবদন্তি লোথার ম্যাথাউস এবং মিরোস্লাভ ক্লোসেকে (উভয়েই ২২টি ম্যাচ) ছাড়িয়ে জার্মানির ইতিহাসে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার বনে যাবেন।
বিপরীতে, প্যারাগুয়ের নকআউটের ইতিহাস একেবারেই গোলশূন্য! বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এ পর্যন্ত ৫টি ম্যাচ খেললেও এখনো কোনো গোলের মুখ দেখেনি লাতিন আমেরিকার দলটি, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোল না করে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় নকআউটে টিকে থাকার এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করলেও পরের দুই ম্যাচে তুরস্ককে ১-০ গোলে হারিয়ে এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে ০-০ ড্র করে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী রক্ষণাত্মক ফুটবল বা ‘সাউথ আমেরিকান গ্রিট’ দিয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে তারা।
ফুটবল পণ্ডিত ও অপ্টার প্রেডিকশন বলছে, জার্মানির রক্ষণভাগে কিছুটা খামতি থাকলেও গোল করার ক্ষেত্রে তারা এক মূর্তিমান আতঙ্ক। প্যারাগুয়ে আক্রমণভাগে তেমন কোনো ধার না দেখাতে পারলে জার্মানির কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে পারে। ন্যুয়েরের রেকর্ডের রাতে জার্মানি আবার ২০১৪-র সেই বিশ্বজয়ের সুবাস ছড়াতে পারে কি না, তা বোস্টনের মাঠেই প্রমাণ হবে!