বিশ্বকাপের নতুন মঞ্চে আজ মঙ্গলবার টেক্সাসের ডালাস স্টেডিয়ামে এক চরম রোমাঞ্চকর ও ঐতিহাসিক দ্বৈরথের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। রাত ১১টায় শেষ বত্রিশের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে আফ্রিকার ‘ইলেফ্যান্টস’ খ্যাত আইভরি কোস্ট এবং ইউরোপের উদীয়মান পরাশক্তি নরওয়ে। একদিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে উঠে ইতিহাস গড়া আইভরি কোস্ট, অন্যদিকে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করে হইচই ফেলে দেওয়া নরওয়ে। দুই দলের লক্ষ্য একটাই, যে কোনো মূল্যে শেষ ১৬ বা কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করা।
এমার্স ফায়ের অধীনে আইভরি কোস্ট অত্যন্ত কঠিন গ্রুপ ‘ই’ থেকে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে এসেছে। প্রথম ম্যাচে ইকুয়েডরকে ১-০ গোলে হারিয়ে শুভসূচনা করার পর জার্মানির মতো হেভিওয়েটের বিরুদ্ধে ফ্রাঙ্ক কেসির গোলে এগিয়ে থেকেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২-১ ব্যবধানে হারতে হয় তাদের। তবে শেষ ম্যাচে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায় আফ্রিকান জায়ান্টরা; নিকোলাস পেপের চোখ ধাঁধানো জোড়া গোলে কুরাসাওকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে রূপকথার মতো প্রথমবারের মতো শেষ ৩২ নিশ্চিত করে তারা।
অন্যদিকে স্টেল সোলবাকেনের নরওয়ে এবার টুর্নামেন্টের অন্যতম বিনোদন দেয়া দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। গ্রুপ ‘আই’-তে ইরাক ও সেনেগালকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে নকআউটের টিকিট কাটে তারা। যদিও শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হতে হয়েছে তাদের। তবে নরওয়ের আসল ভয়ংকর রূপের নাম আর্লিং হলান্ড! গ্রুপ পর্বেই একাই ৪টি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তরতরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই খুনে স্ট্রাইকার। দেশের হয়ে ৫২ ম্যাচে ৫৯ গোল করা এই ‘গোলমেশিন’ রাতে আইভরি কোস্টের ডিফেন্স গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য পুরোপুরি তৈরি।
ইনজুরি আপডেট ও মাঠের প্রধান চরিত্ররা: এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আইভরি কোস্ট শিবিরে কিছুটা চিন্তার কারণ ডিফেন্ডার উইলফ্রিড সিঙ্গোর হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি। তিনি খেলতে না পারলে রক্ষণভাগের মূল দায়িত্ব থাকবে ওসমানে দিওমান্দে এবং ওডিলন কোসোনুর কাঁধে। মাঝমাঠে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা অভিজ্ঞ ফ্রাঙ্ক কেসি, যিনি চলতি টুর্নামেন্টে দলের ৩টি গোলের ২টিতেই সরাসরি অবদান রেখেছেন। আর আক্রমণে মূল ভরসা গত ম্যাচের নায়ক নিকোলাস পেপে।
অন্যদিকে নরওয়ে শিবিরেও আছে ইনজুরির হাওয়া। উরুর সমস্যার কারণে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের ডিফেন্ডার জুলিয়ান রিয়ারসন অনুশীলনে ছিলেন না। তিনি আজ খেলতে না পারলে ফ্রেডরিক আওয়ার্সনেসকে নিচে নেমে আসতে হবে, আর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ থাকবে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড এবং স্যান্ডার বার্গের জাদুকরী পায়ে। ওডেগার্ডের পা থেকে নরওয়ের প্রতিটি জয়েই অবদান এসেছে, তাই আজকেও তাঁর পাসের ওপর নির্ভর করবেন হলান্ড।
ইতিহাসের পাতা: পরিসংখ্যান বলছে, আইভরি কোস্ট তাদের শেষ ৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের ৫টিতেই জিতেছে এবং গ্রুপ পর্বে ৩ ম্যাচে গোল হজম করেছে মাত্র ২টি। বিপরীতে, নরওয়ে ৩ ম্যাচে ৮ গোল (ম্যাচ প্রতি ২.৬৭ গড়) করলেও তাদের ডিফেন্সের অবস্থা বেশ করুণ। শেষ ১০ ম্যাচের মাত্র ১টিতে ক্লিন শিট (গোল না খাওয়া) রাখতে পেরেছে তারা। নরওয়ের গ্রুপ পর্বের ৩টি ম্যাচের প্রতিটিতেই দু'দলই গোল করেছে। আর নরওয়ে ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচ খেলতে নামছে।
ম্যাচ প্রেডিকশন: ফুটবল পণ্ডিত ও অপ্টার চুলচেরা বিশ্লেষণ বলছে, আইভরি কোস্টের জমাট রক্ষণের সামনে নরওয়ের নড়বড়ে ডিফেন্স কিছুটা কোণঠাসা হতে পারে। কিন্তু নকআউটের ভাগ্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় ব্যক্তিগত দক্ষতার জাদুতে, আর নরওয়ে শিবিরে সেই জাদুর নাম আর্লিং হলান্ড। সব হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে নরওয়ে শেষ ষোলতে জায়গা করে নেবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ডালাসের মাঠে আজ আফ্রিকান হাতির গর্জন চলবে নাকি ভাইকিংদের জয়োল্লাস হবে, তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে পুরো ফুটবল দুনিয়া!