রাশিয়া বিশ্বকাপের সেই রোস্তভ-অন-ডনের রাতের কথা মনে আছে? জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের ২১ মিনিট বাকি থাকতেও ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিলো বেলজিয়াম। সেখান থেকে অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তনে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল ‘রেড ডেভিলস’রা। আট বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও দেখা গেলো সেই একই দৃশ্যপট, প্রমাণিত হলো ম্যাচের মানচিত্র বদলে কতোটা পটু বেলজিয়াম। এবারও ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও অতিরিক্ত সময়ের ১২৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে ইউরি টিলেমানসের পেনাল্টি গোলে সেনেগালকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে তারা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দেরিতে হওয়া এই গোলের পর সেনেগালের খেলোয়াড়দের চোখে-মুখে ছিল তীব্র অবিচারের ক্ষোভ। গত জানুয়ারিতে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে হারের পর, আরও একটি নকআউট ম্যাচ থেকে এভাবে বিদায় মেনে নিতে পারছিলেন না আফ্রিকান দলটির ফুটবলাররা। শেষ বাঁশি বাজার পর অশ্রুসিক্ত লামিন কামারাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা ছিলো না কারও। অন্যদিকে এই জয়ে আগামী সোমবার (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত ১টা) শেষ ষোলোর ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হবে বেলজিয়াম।
২০১৮ সালের সেই জাপান ম্যাচের সাক্ষী থাকা থিবো কুর্তোয়া, টমাস মিউনিয়ের, রোমেলু লুকাকু এবং কেভিন ডি ব্রুইন—সবাই আজকেও মাঠে ছিলেন। তবে আজকের ম্যাচের চিত্রনাট্য ছিলো আরও বেশি রোমাঞ্চকর। প্রথমার্ধে হাবিব দিয়ারার গোলে সেনেগাল এগিয়ে যাওয়ার পর, দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ইসমাইলা সার। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া খেলার ছন্দ বদলাতে দ্বিতীয় হাফের ১১ মিনিটের মাথায় জেরেমি ডোকু এবং দলের প্রাণভোমরা কেভিন ডি ব্রুইনকেও মাঠ থেকে তুলে নেন।
খেলার মোড় ঘুরে যাওয়ার পেছনে দ্বিতীয় মেয়াদের ড্রিঙ্কস ব্রেকের একটি ঘটনাকে মনে করা হচ্ছে। সে সময় মাঠে ইউরি টিলেমানস এবং লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় ও তর্কাতর্কি হয়। রোমেলু লুকাকু ও নিকো রাসকিন এসে দুজনকে শান্ত করেন।
কোচ রুডি গার্সিয়া এই আক্রমণাত্মক মনোভাবকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, লুকাকু ওদের শান্ত করেছিলো। আমি জানি না ওরা কেন তর্ক করছিলো, কিন্তু মাঠের এই দৃঢ়তা আমার ভালো লেগেছে। ১৮ মাস আগে যখন দায়িত্ব নিই, দলটির আক্রমণাত্মক মানসিকতার অভাব ছিলো। আজ তারা টিকে থাকার লড়াইটা দেখিয়েছে।
কোচের একের পর এক বদলি খেলোয়াড় নামানোর সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত কাজে দেয়। বিরতির পর চার্লস ডি কেটেলারের পরিবর্তে মাঠে নামেন রোমেলু লুকাকু। ৮৬ মিনিটে মিউনিয়েরের ক্রস থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করে ব্যবধান ২-১ এ নামিয়ে আনেন লুকাকু।
নির্ধারিত সময়ের ছয় মিনিট বাকি থাকতে সেনেগালের তারকা সাদিও মানে প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন। থিবো কুর্তোয়া যদি ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই নিশ্চিত গোল না ঠেকাতেন, তবে ৩-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে ওখানেই ম্যাচ শেষ হয়ে যেত বেলজিয়ামের।
প্রথম গোলেরর তিন মিনিট পর, অর্থাৎ ৮৯ মিনিটে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম। ট্রোসার্ডের চমৎকার ক্রস থেকে উঁচুতে লাফিয়ে দুর্দান্ত এক হেডারে সেনেগালের গোলরক্ষক মরি দিয়াকে পরাস্ত করেন টিলেমানস (২-২)। সেনেগালের দাবি ছিলো টিলেমানস ডিফেন্ডার মুসা নিয়াখাতেকে ধাক্কা দিয়েছেন, তবে রেফারি তাতে সাড়া দেননি।
ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে ১২৪ মিনিটের মাথায় দোদি লুকেবাকিওর একটি শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। কিন্তু তার কয়েক সেকেন্ড আগেই বেলজিয়ামের টিলেমানসের বাম গোড়ালিতে আঘাত করেন সেনেগালের লামিন কামারা। ভিএআর চেকে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি সাঈদ মার্তিনেজ। সেনেগালের খেলোয়াড়রা পেনাল্টি স্পট ঘিরে ধরে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করলেও টিলেমানস লক্ষ্যভেদ করতে ভুল করেননি।
ম্যাচ শেষে সেনেগালের প্রধান কোচ পাপে থিয়াও বলেন, এটি একটি নির্মম পরাজয়। আমরা ২-০ গোলে এগিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু একটি ফুটবল ম্যাচ তো আর ৮৫ মিনিটের নয়। বেলজিয়াম ম্যাচে ফিরে এসেছিলো এবং আমরা তা সামলাতে পারিনি। ২০১৮ সালে ঠিক এমনই নির্মম পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলো এশিয়ান হর্স জাপান। আজকের পেনাল্টি থেকে গোলকে অনেক সহজ করে দেখা গেলেও, সেদিনের লুকাকুর সেই কাউন্টার অ্যাটক অনেকদিন মনে থাকবে ফুটবল প্রেমিদের।