আলজেরীয় ‘স্ট্রিট’ ফুটবলারদের রুখতে তৈরি সুইস বাহিনী

বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউটের প্রথম পর্বে হাইভোল্টেজ ম্যাচে শুক্রবার সকাল ৯টায় ভ্যাঙ্কুভারে মুখোমুখি হচ্ছে সুইজারল্যান্ড ও আলজেরিয়া। তবে, মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এই ম্যাচটি রূপ নিয়েছে এক অদ্ভুত আবেগ ও চেনা গুরুর বিরুদ্ধে শিষ্যের লড়াইয়ের গল্পে। সুইস উইঙ্গার ক্রিশ্চিয়ান ফাসনাখট মাঠে নামছেন তাঁরই সাবেক গুরু এবং আলজেরিয়ার বর্তমান কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচের বিরুদ্ধে।

এই পেতকোভিচই ইউরো ২০২০ আসরের শেষ ষোলোর ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাসনাখটকে মাঠে নামিয়ে বড় আসরে তাঁর অভিষেক করিয়েছিলেন। দীর্ঘ দিন পর বিশ্বকাপে সেই পুরোনো গুরুর মুখোমুখি হওয়া নিয়ে ফাসনাখট সুইস গণমাধ্যম ব্লিককে বেশ আবেগভরেই বলেন, তাঁর সাথে আবার দেখা হওয়াটা দারুণ ব্যাপার হবে। এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বিশেষ ম্যাচ। জীবন যেন এক বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে চলেছে। তিনি আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্পেশাল কোচ, যাঁর হাত ধরে আমি প্রথম জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলাম।

Switzerland Team 01
তবে গুরুর প্রতি ভক্তি থাকলেও বর্তমান কোচ মুরাত ইয়াকিনের অধীনে সুইজারল্যান্ড ফুটবল কৌশলে অনেক বেশি ক্ষুরধার হয়েছে বলে মনে করেন ফাসনাখট। দুই কোচের তুলনা টেনে তিনি বেশ রসিয়েই বলেন, ভ্লাদোর ফুটবল শৈলী ছিল বেশ সহজ ও সরাসরি। অন্যদিকে, বর্তমান কোচ ‘মুরি’ (ইয়াকিন) হলেন একজন জাত ‘কৌশলী শেয়াল’, যিনি ফুটবলের প্রতিটি নিখুঁত খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। সহ-আয়োজক কানাডা, বসনিয়া ও কাতারকে পেছনে ফেলে বি-গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়েই নকআউটে এসেছে সুইসরা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের গ্রুপ থেকে ৪ পয়েন্ট নিয়ে অন্যতম সেরা তৃতীয় দল হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে আলজেরিয়া।

আলজেরিয়ার ফুটবলারদের ‘স্ট্রিট ফুটবলার’ বা পাড়ার ফুটবলার হিসেবে আখ্যা দিয়ে ফাসনাখট তাদের দুর্বলতাও ফাঁস করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, ওরা প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে খেলে এবং বল পায়ে প্রত্যেকেই দারুণ টেকনিক্যাল। তবে, আমাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট হলো, আক্রমণ করতে গিয়ে ওরা নিজেদের রক্ষণভাগের কথা একপ্রকার ভুলেই যায়! সকালের ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের সিলভান উইডমারকে নিয়ে কিছুটা চোটের শঙ্কা থাকায় রাইট-ব্যাকের দায়িত্ব পেতে পারেন লুকা জাকুয়েজ। অন্যদিকে আলজেরিয়া তাদের ফরোয়ার্ড মোহামেদ এল আমিনে আমুরাকে ছাড়াই মাঠে নামতে পারে।

পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে দেখা যায়, টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পার করলেও ২০০৬ সালের পর এই প্রথম গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সুইজারল্যান্ড। দলের জোয়ান মানজাম্বি এবং রুবেন ভার্গাস ১৯৫৪ সালের পর প্রথম সুইস সতীর্থ হিসেবে বিশ্বকাপের টানা দুই ম্যাচে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। পেনাল্টি পাওয়ার ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনার (২টি) সাথে যৌথভাবে শীর্ষে আছে সুইজারল্যান্ড। এছাড়া বদলি খেলোয়াড়দের দিয়ে গোল করানোর ওস্তাদও তারা; সেনেগালের (৪টি) পরেই জার্মানি ও কানাডার সাথে যৌথভাবে ৩টি বদলি গোল এসেছে সুইসদের পা থেকে।

Algeria Team 01
বিপরীতে আলজেরিয়া ২০১৪ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে পা রেখেছে। এবার আফ্রিকা মহাদেশের ১০টি দলের মধ্যে ৯টি দলই গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার করে ইতিহাস গড়েছে, যা এর আগে কোনো বিশ্বকাপে দেখা যায়নি। আলজেরিয়ার ২৪ বছর বয়সী রাফিক বেলঘালি অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করে ১৯৮২ সালের পর দেশের কনিষ্ঠতম বিশ্বকাপ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছেন। অন্যদিকে ৩৫ বছর বয়সী অভিজ্ঞ রিয়াদ মাহরেজও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক বিশ্বকাপ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন।

ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইজারল্যান্ড এখনো তাদের চেনা সেরা ছন্দে ফিরতে না পারলেও নকআউটের এই মরণ-বাঁচন লড়াইয়ে তাদের অভিজ্ঞ স্কোয়াডই পার্থক্য গড়ে দেবে। আলজেরিয়ার দুর্বল ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে সুইসরা আগামীকাল ২-১ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে শেষ ষোলোর টিকিট কেটে কলম্বিয়া বা ঘানার মুখোমুখি হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, শিষ্যের এই হুঙ্কারের জবাবে গুরু পেতকোভিচ আলজেরিয়াকে নিয়ে কী ছক আঁকেন!