আর্জেন্টাইন ফুটবলের খোলনলচে বদলে দেওয়া এক রূপকথার কারিগর লিওনেল স্কালোনি। শুক্রবার মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার ডাগআউটে ‘১০০ ম্যাচ’ ছোঁয়ার এক অবিশ্বাস্য মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছেন এই মাস্টারমাইন্ড।
আলবিসেলেস্তেদের ইতিহাসে গুইলার্মো স্তাবিলের (১২৭ ম্যাচ) পর দ্বিতীয় কোনো কোচ হিসেবে শততম ম্যাচের এই ক্লাবে প্রবেশ করছেন তিনি, যা সিজার লুইস মেনত্তি কিংবা কার্লোস বিলার্দোর মতো কিংবদন্তিরাও করে দেখাতে পারেননি। তবে স্কালোনির এই ১০০ ম্যাচের গল্পটা শুধু সংখ্যার নয়; এটি এক চরম অনিশ্চয়তা, সমালোচনা আর ঘুরে দাঁড়ানোর মহাকাব্য, যার মূল মন্ত্র ছিল তাঁর বাবা ডন অ্যাঙ্গেল ওমরের দেয়া সেই অমোঘ বাণী, ‘থামো না, এগিয়ে যাও (কিপ গোয়িং)’।
ছোটবেলায় পুজাতো থেকে রোসারিওতে অনুশীলনে যাওয়ার পথে কিংবা পরবর্তীতে দেপোর্তিভো, লাৎসিও, ওয়েস্ট হ্যাম ও আতালান্তার হয়ে খেলার দিনগুলোতে স্কালোনির বাবা সবসময় একটি কথাই বলতেন, ‘জয় আসুক বা পরাজয়, পরদিন সূর্য ঠিকই উঠবে এবং তোমাকে আবার কাজে ফিরতে হবে’। বাবার সেই জীবনবোধ ও মানসিক ভারসাম্যকেই স্কালোনি তাঁর কোচিং দর্শনে রূপ দিয়েছেন।
অথচ ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের ক্ষত আর একের পর এক ফাইনাল হারার হতাশায় নিমজ্জিত ছন্নছাড়া এক আর্জেন্টিনার অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব যখন স্কালোনি নিয়েছিলেন, তখন চারদিকে শুধুই ছিল সমালোচনা আর সংশয়। পচেত্তিনো, গ্যালার্দো, সিমেওনে কিংবা পেপ গার্দিওলার মতো হাইপ্রোফাইল নামগুলো বাদ দিয়ে অনভিজ্ঞ স্কালোনিকে দায়িত্ব দেওয়ায় ফুটবল পণ্ডিতরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘স্কালোনি? সে আবার কে?’
কিন্তু আর্জেন্টিনার দীর্ঘ খরা কাটানোর মূল রূপকার ক্লদিও তাপিয়া এবং কিংবদন্তি মেনত্তি তাঁর ওপর ভরসা রেখেছিলেন। হোসে পেকারম্যানও তাঁর এই ‘প্রিয় শিষ্য’কে শান্ত থেকে তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলে নতুন দল গড়ার টোটকা দিয়েছিলেন।
স্কালোনির অধীনেই লিওনেল মেসি কোনো ‘সুপারহিরো’র মতো একা কাঁধে দল টানার চাপ থেকে মুক্ত হয়ে দলের একজন সাধারণ অথচ সেরা সদস্য হিসেবে ডানা মেলার স্বাধীনতা পান। সাথে যোগ হন দি মারিয়া ও ওতামেন্দির মতো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি ডিবু মার্তিনেস, কুতি রোমেরো, রদ্রিগো দে পল ও লাউতারো মার্তিনেসদের মতো একঝাঁক তরুণ তুর্কি।
২০১৯ কোপা আমেরিকায় প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ফ্রাঙ্কো আরমানি যদি পেনাল্টিটা না ঠেকাতেন, তবে হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো। কিন্তু সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক অপরাজেয় ‘স্কালোনেতা’। মারাকানায় তিতের ব্রাজিলকে হারিয়ে ৩৬ বছরের খরা কাটানো, ফিনালিসিমায় ইতালিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া আর অবশেষে লুসাইলে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বজয়ের মুকুট পরা, সবই যেন এক সুতোয় গেঁথেছিলেন এই ল্যাংকা কাণ্ডারি।
বিশ্বকাপের পর মানসিক চাপ ও ক্লান্তিতে ২০২৩ সালের দিকে স্কালোনি যখন ‘বারটা অনেক উঁচুতে উঠে গেছে’ বলে কোচের পদ ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তখন পুরো আর্জেন্টিনা কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু তিনি ফিরে এসেছেন, ২০২৪ কোপা আমেরিকা জিতেছেন এবং তরুণ প্রজন্মকে দলে জায়গা করে দিতে নিজেকে বারবার ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। মোন্তিয়েল, আকুনিয়া বা হুলিয়ান আলভারেজদের ফর্মে থাকার তাড়না এনে দিয়েছেন।
মাঠে মেসি উজ্জ্বল, আকাশে ডিবু অতন্দ্র প্রহরী, আর মাঝমাঠে এনজো-অ্যালিক্সিসদের দাপট- সবই সত্য; তবে এই দলের আসল চালিকাশক্তি ডাগআউটে বসা সেই ৪৮ বছর বয়সী মানুষটি, যিনি খেলোয়াড়দের অন্তরাত্মা ছুঁয়ে দেখতে জানেন।
কাতার থেকে দোহা, আর মায়ামি থেকে পাম্মা দে মায়োর্কার সমুদ্রসৈকত—স্কালোনি আর্জেন্টাইনদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা নোয় না করে সব পরিস্থিতিতে ‘এগিয়ে যেতে হয়’। আজ শততম ম্যাচের মাইলফলকে দাঁড়িয়ে তাই পুরো আর্জেন্টিনা কুর্নিশ জানাচ্ছে তাদের এই ম্যাজিশিয়ানকে!