নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ষোল থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের ক্ষত এখনো দগদগে। আর এই বিদায়ের পর ফুটবল মহলে এখন সবচেয়ে বড় কাঁটাছেঁড়া চলছে প্রথমার্ধে ব্রুনো গিমারায়েসের সেই পেনাল্টি মিস নিয়ে, সমানতালে চলছে কোচের সমালোচনাও।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মুড়ি-মুড়কির মতো গোল করা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র মাঠে থাকতেও কেন খণ্ডকালীন পেনাল্টি টেকার ব্রুনো গিমারায়েসের হাতে বল তুলে দেওয়া হলো, তা নিয়ে ভক্তদের ক্ষোভের শেষ নেই। অবশেষে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পেছনের ‘অদ্ভুত’ যুক্তি দিয়েছেন সেলেসাও বস কার্লো আনচেলত্তি। কিন্তু তাঁর সেই পরিসংখ্যানের তত্ত্ব যেন হিতে বিপরীত হয়ে ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্নকেই কবর দিয়ে দিল!
ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের তৈরি করা এক বছরের ডেটাবেস ও পরিসংখ্যানের ফিরিস্তি দিয়ে আনচেলত্তি ব্যাখ্যা করেন, আমরা আমাদের এবং প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের পুরো এক বছরের পেনাল্টির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাদের তালিকায় সেরা পেনাল্টি টেকার হলেন নেইমার, এরপর যথাক্রমে ইগর থিয়াগো, রাফিনিয়া, ব্রুনো গিমারায়েস এবং গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি।
ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড আরও যোগ করেন, আমরা ব্রুনোকেই বেছে নিয়েছিলাম কারণ আমাদের মনে হয়েছিল ওই মুহূর্তে ও-ই মাঠের সেরা ফুটবলার ছিল। এমনকি প্রথমার্ধের খেলা শেষে আনচেলত্তির ছেলে ও সহকারী কোচ ডেভিড আনচেলত্তিও নিশ্চিত করেন, ম্যাচে কে পেনাল্টি নেবে তা খেলা শুরুর আগেই ড্রেসিংরুমে স্ক্রিপ্ট করে দেওয়া হয়েছিল!
কিন্তু বিধি বাম! আনচেলত্তির সেই খাতা-কলমের হিসেব মাঠের বাস্তবতার সাথে একেবারেই মেলেনি। যখন মাথেউস কুনিয়া বক্সে ফাউলের শিকার হলেন এবং রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন, তখন আনচেলত্তির তালিকার শীর্ষ তিন পেনাল্টি বিশেষজ্ঞের একজনও মাঠে ছিলেন না!
ট্যাকটিক্যাল কারণে ইগর থিয়াগো স্কোয়াডেই ছিলেন না, গ্রুপ পর্বে হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে পেশির চোটে পড়ে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গিয়েছিলেন রাফিনিয়া, আর মূল ভরসা নেইমারকে তো আনচেলত্তি নিজেই বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছিলেন! (যদিও দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে অতিরিক্ত সময়ে ক্যাসেমিরো ফাউলের শিকার হলে ঠিকই নিখুঁত পেনাল্টিতে গোল করেন নেইমার)।
ফলস্বরূপ, খাতা-কলমের চার নম্বর চয়েজ ব্রুনো গিমারায়েস যখন শট নিতে এলেন, তখন তিনি নার্ভ ধরে রাখতে পারেননি। মাঝারো উচ্চতায় নেওয়া তাঁর দুর্বল শটটি নরওয়েজিয়ান কিপার ন্যালান্ড অনায়াসেই সেভ করে দেন। অথচ গত ইউরোপীয় মরসুমে নিউক্যাসলের হয়ে দুটি পেনাল্টি মারলেও ব্রুনো কিন্তু ক্লাবের নিয়মিত বা অফিশিয়াল পেনাল্টি টেকার ছিলেন না!
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আনচেলত্তির ল্যাপটপের ডেটায় ভিনিসিয়াসের নাম প্রথম পাঁচে ছিল না! অথচ সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সাত-সাতটি পেনাল্টি নেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল ভিনির ঝুলিতে, যার মধ্যে পাঁচটিতেই তিনি সফল হয়েছিলেন। এমনকি ২০২৩ সালে গিনির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচেও জাতীয় দলের হয়ে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন ভিনি। রিয়াল মাদ্রিদের ঘরের ছেলেকে চেনা উইনিং ট্র্যাকে ভরসা না করে, আনচেলত্তি ভরসা করলেন পরিসংখ্যানের অন্ধ জুয়ায়। আর ওস্তাদের এই অতি-চালাকির মাশুল দিয়ে মাঠের পেনাল্টি মিসের সাথে সাথে পুরো বিশ্বকাপ থেকেই ‘মিস’ হয়ে গেল ব্রাজিল!