বিশ্বকাপের বিশ্বমঞ্চে গত ২৪ ঘণ্টা ধরে যিনি ছিলেন সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, সেই মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলোরিন বালোগুন সোমবার বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ম্যাচের পর যেন এক লহমায় খড়কুটোর মতো উড়ে গেলেন। ফিফার নজিরবিহীন ও বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তে লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা থেকে পার পেয়ে শেষ ষোলোর ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী এই তারকা।
কিন্তু হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে ফিফার সর্বোচ্চ মহলের এত নাটকীয় তদ্বিরের পরও শেষ রক্ষা হলো না সহ-স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের। সিয়াটল স্টেডিয়ামে বেলজিয়ামের রেড ডেভিলসদের কাছে ৪-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল আমেরিকা।
অথচ গ্রুপ পর্বে ৩ গোল এবং দুর্দান্ত প্লে-মেকিং দিয়ে আমেরিকাকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন করা এবং লাস্ট-৩২ এর ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে বিদায় করার মূল কারিগর ছিলেন এই বালোগুনই। কিন্তু বসনিয়ার বিরুদ্ধে লাল কার্ড দেখায় নিয়ম অনুযায়ী এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল তাঁর। আর ঠিক এখানেই শুরু হয় মাঠের বাইরের নোংরা রাজনীতি।
ফিফা হঠাৎ করেই বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়, যার পুরো কৃতিত্ব নিজের কাঁধে নেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! ফিফা এই সিদ্ধান্তকে ‘স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত’ বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ফুটবল বিশ্ব ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া তো ফিফাকে খোঁচা দিয়ে বলেই বসেন, আজ কি এপ্রিল ফুল নাকি?
বিতর্কের মাঝেই বালোগুনের ব্যক্তিগত জীবন ও নাগরিকত্ব নিয়েও শুরু হয়েছে চরম ট্রোল। নাইজেরিয়ান মা সন্তানসম্ভবা অবস্থায় নিউ ইয়র্ক ভ্রমণে এসে বিমানের ফ্লাইং ডেট মিস করায় বাধ্য হয়ে সেখানেই বালোগুনের জন্ম দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্থরাইট সিটিজেনশিপ’ বা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পান বালোগুন।
অথচ ট্রাম্প নিজে বারবার এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন! সেই ট্রাম্পই আবার নিজের দেশের স্বার্থে বালোগুনকে খেলাতে ফিফার ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছেন বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। যদিও মার্কিন মিডফিল্ডার টাইলার অ্যাডামস ম্যাচ শেষে দাবি করেছেন, ড্রেসিংরুমের খেলোয়াড়েরা এই মাঠের বাইরের বিতর্ক নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায়নি।
মাঠের বাইরের এই হাই-ভোল্টেজ ড্রামার পর সিয়াটল স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শক যখন বালোগুন মাঠে নামার সাথে সাথে গগনবিদারী চিৎকার জুড়েছিলেন, তখন মনে হয়েছিল বেলজিয়ামকে আজ একাই গুঁড়িয়ে দেবেন এই স্ট্রাইকার। কিন্তু মাঠের ভেতরে বেলজিয়ামের ইস্পাতকঠিন ডিফেন্সের সামনে বালোগুনকে আস্ত এক ‘নবিশ’ ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি।
পুরো ম্যাচে বেলজিয়ান ডিফেন্ডাররা তাঁকে মাত্র ৩ বার শট নেওয়ার সুযোগ দেয়, যার মাত্র একটি ছিল অন-টার্গেট। ৩১ মিনিটে তাঁর আদায় করা এক ফ্রি-কিক থেকে মালিক টিলম্যান গোল করে সমতা (১-১) এনে দিলেও, বেলজিয়ামের রুদ্রমূর্তির সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে মার্কিন ডিফেন্স। শেষ পর্যন্ত ৪-১ গোলের মহাকাব্যিক জয়ে ফিফার পক্ষপাতিত্বের গালে সপাটে চড় মেরে কোয়ার্টারে চলে গেল বেলজিয়াম, আর ট্রাম্পের ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ বালোগুন বিদায় নিলেন এক বুক লজ্জা নিয়ে।