ফিলাডেলফিয়ার মাঠে পেনাল্টি থেকে গোল করে পরাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করেছিলেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। কিন্তু সেই ম্যাচ শেষের রেশ কাটতে না কাটতেই মাঠের লড়াই রূপ নিল এক নোংরা ও কুৎসিত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে। পরাগুয়ের এক নারী সেনেটরের চরম বর্ণবাদী ও জাতিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন ফরাসি এই মহাতারকা। তবে দমে যাওয়ার পাত্র নন এমবাপ্পেও। সোমবার সেই নারী রাজনীতিবিদকে সরাসরি ‘ঘৃণ্য ও পদের অযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়ে মাঠের বাইরের এক বিস্ফোরক কাউন্টার-অ্যাটাক হেনেছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ স্ট্রাইকার।
ঘটনার সূত্রপাত পরাগুয়ের সেনেটর সেলেস্তে আমারিলার একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে। পরাগুয়ে বিদায় নেয়ার পর সামাজিক মাধ্যম এক্সে এমবাপেকে নিয়ে এক দীর্ঘ, বর্ণবাদী বিষোদ্গার করেন তিনি। সেখানে তিনি এমবাপেকে উপনিবেশের এক ক্যামেরুনিয়ান, যে নিজেকে ফরাসি বলে চালিয়ে দেয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন। এখানেই খান্ত হননি ওই সেনেটর, এমবাপেকে ‘বর্বর’ এবং ‘লিখতেও না জানা মূর্খ’ বলে কটাক্ষ করার পাশাপাশি উস্কানি দিয়ে বলেন, ম্যাচ শেষে পরাগুয়ের খেলোয়াড়দের উচিত ছিল এমবাপেকে সপাটে চড় মারা!
এই নোংরা আক্রমণের জবাবে ফরাসি কাপ্তান এমবাপে এক কড়া বিবৃতি জারি করেন, যেখানে তিনি শুধু নিজের সম্মানই বাঁচাননি, বরং প্রতিপক্ষ পরাগুয়ের ফুটবলারদের প্রতিও এক অনন্য উদারতা দেখিয়েছেন। এমবাপ্পে সরাসরি সেনেটরকে ধুয়ে দিয়ে লেখেন, ম্যাডাম সেলেস্তে আমারিলা, আপনি একজন অত্যন্ত ঘৃণ্য নারী এবং আপনার এই পদের জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য। আপনি পরাগুয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না; যে দেশটি এই পুরো টুর্নামেন্টে নিজেদের ঘাম, আবেগ ও সম্মান দিয়ে লড়েছে। আপনার এই অবিবেচকের মতো আচরণ এবং নির্লজ্জ বর্ণবাদের কারণে আজ পুরো বিশ্ব পরাগুয়ের খেলোয়াড়দের সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের কথা ভুলে গেছে। আপনার মতো এক অযোগ্য নারী নিজের দেশের ভাবমূর্তি বিশ্বের কাছে ক্ষুণ্ন করেছেন। আমি আপনার মতো মানুষদের কখনোই সারা বিশ্বে ঘৃণা ও বর্ণবাদ ছড়ানোর স্বাধীনতা দেব না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন বিষয়টিকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করে ওই সেনেটরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে পরাগুয়ে সরকারও তাদের নিজস্ব সেনেটরের এই ধৃষ্টতা থেকে সম্পূর্ণ দূরত্ব বজায় রেখে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ওই সিনেটরের বক্তব্য একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত দায়িত্ব, এর সাথে পরাগুয়ের সরকার বা দেশের জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি পরাগুয়ের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি বাসিলিও নুনিয়েজও এই বর্ণবাদী বার্তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
ফ্রান্সের সহকারী কোচ গাই স্টিফেন এই ঘটনাকে লজ্জাজনক, জঘন্য ও আপত্তিকর বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্বয়ং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো মঙ্গলবার এমবাপের পাশে দাঁড়িয়ে এক্সে লিখেছেন, কিলিয়ান এমবাপ্পের আরেকটি গোল! তবে এবার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। আমার পূর্ণ সমর্থন রইল তোমার প্রতি। যখন কুৎসিত শব্দ আমাদের কলঙ্কিত করতে চায়, তখন আমাদের মূল্যবোধই তার জবাব দেয়: মর্যাদা, সম্মান ও ভ্রাতৃত্ব। মাঠের খেলায় পরাগুয়েকে হারিয়ে ফ্রান্স কোয়ার্টারে উঠলেও, মাঠের বাইরের এই লড়াইয়ে এমবাপে যেভাবে এক নোংরা রাজনীতিকে স্তব্ধ করে দিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় আর এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।