বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের আবেগ, আনন্দ আর সম্প্রীতির এক মহোৎসব। তবে বাংলাদেশ যেন এই উৎসবের চেনা সমীকরণ উল্টে গেছে। দেশ থেকে ১২ হাজার কিলোমিটার দূরের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে উগ্র উন্মাদনা ও সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১০ জন সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
ফুটবল খেলোয়াড়, কোচ ও সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বকাপকে কেবল বিনোদন ও সুস্থ প্রতিযোগিতা হিসেবে নেওয়ার আহবান জানানো হলেও থামছে না এই নৃশংসতা। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলার মাঠের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত আসলে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও জাতিগত সহনশীলতাহীন মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের সংঘর্ষে মো. শরিফুল ইসলাম (৩২) নামের এক রিকশাচালক নিহত হন। নিহত শরিফুল মিশরের সমর্থক ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, আর্জেন্টিনা সমর্থক হিসেবে পরিচিত দুই ব্যক্তি তার মাথায় মারাত্মক আঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় কুমিল্লা মেডিক্যার কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
বিশ্বকাপ শুরুর পর গত এক জুলাই দেশের আলাদা তিনটি স্থানে তিন জন নিহত হন। এর মধ্যে রাজধানীর আদাবরে খেলা দেখার সময় বাঁশি বাজানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আবুল বাশার বাদশা নামে এক স্থানীয় বিএনপি নেতা নিহত হন। আশুলিয়ায় ফুটবল ম্যাচ নিয়ে বিরোধের জেরে নাহিদ হাসান নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। একই দিনে সিলেটের জকিগঞ্জে ফুটবল খেলার উল্লাসকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে নিহত হন আলম আহমদ।
এছাড়া গত শুক্রবার নড়াইল সদরে কিশোরদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে মোস্তফা কাজী নামে এক বৃদ্ধকে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা ঘটে।
শুধু প্রাণহানিই নয়, গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খেলা নিয়ে ঘটেছে একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
৬ জুলাই (বগুড়া): শিবগঞ্জে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জয় কুমার ও বিশাল কুমার নামে দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।
২৯ জুন (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়): বড়ো পর্দায় খেলা দেখার সময় ধূমপান করাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
২৮ জুন (হবিগঞ্জ): উচাইল স্কুলবাড়ি মাঠে বড়ো পর্দায় খেলা দেখানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন।
২২ জুন (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়): বড়ো পর্দায় খেলা দেখা নিয়ে সংঘর্ষ ও মারধরের ঘটনায় এক শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
১৮ জুন (সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম): ফুটবল খেলা নিয়ে তুচ্ছ বিরোধে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে নারীসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
বিশ্বকাপকে ঘিরে উগ্রতার এই চিত্র কোনোভাবেই মানতে পারছেন না সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা। সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আরিসা জানায়, সে আর্জেন্টিনার সমর্থক আর তার বোন ব্রাজিলের। তারা একসঙ্গে খেলা দেখে আনন্দ পায়, কখনও মারামারি করে না।
পর্তুগাল সমর্থক রায়হান তার ফ্রান্স সমর্থক বন্ধুকে নিয়েই সবগুলো খেলা দেখছেন। রিকশাচালক সবুর মিয়া জানান, তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল করেন না; যে ভালো খেলে, তার খেলাই উপভোগ করেন।
জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় রেহানা পারভীনের মতে, ফুটবল বিশ্বকাপকে শুধু সুস্থ প্রতিযোগিতা ও বিনোদন হিসেবেই নিতে হবে। এ খেলা নিয়ে সংঘাত ও প্রাণহানি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম বলেন, একটা খেলা দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব। খেলা হলো সম্প্রীতির বন্ধন। অন্য দলের সমর্থকদের প্রতি আমাদের আরও সহনশীল হতে হবে এবং দিনশেষে খেলার সুন্দর জয়কে উপভোগ করতে হবে।
খেলাকে কেন্দ্র করে এই উগ্রতা ও সহিংসতাকে সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, এই সহিংসতার দায় ফুটবলের নয়। বরং এটি আমাদের জাতিগতভাবে সুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে জয়-পরাজয় মেনে না নেওয়ার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। অন্যের মতামতকে সহ্য না করা এবং নিজের মতকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতাই এই নৃশংসতার মূল কারণ।
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সবাইকে সচেতন থাকার এবং এ ধরনের উগ্র উত্তেজনা পরিহার করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, খেলা মানেই আনন্দ। সবাইকে একসঙ্গে মিলেমিশে খেলা দেখার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, খেলার নামে এই ধরনের অবান্তর মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
খেলোয়াড়, সংগঠক ও সমর্থকেরা মনে করছেন, কতিপয় সমর্থকের উগ্রতার কারণে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বাংলাদেশে আনন্দের বদলে আতঙ্কের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা একটি ক্রীড়াবান্ধব সমাজ বিনির্মাণের প্রধান অন্তরায়।