বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালের মঞ্চে চূড়ান্ত হয়ে গেল ফুটবল দুনিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বড় এবং রোমাঞ্চকর এক ‘ব্লকবাস্টার’ মহাযুদ্ধ! আগামী বুধবার আটলান্টার মাঠে মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী-ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালের অগ্নিপরীক্ষায় অতিরিক্ত সময়ের দুইটি নাটকের পর, নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনালে পা রাখে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।
আট বারের ব্যালন ডি'অর জয়ী মহাতারকা মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই প্রথমবার থ্রি-লায়ন্স বা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো, যা এই ম্যাচের উত্তাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ ও প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডকে ‘পাওয়ারহাউস’ আখ্যা দিয়ে লিওনেল মেসি ইএসপিএন আর্জেন্টিনা’র কাছে নিজের চনমনে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, অবশ্যই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলাটা স্পেশাল, কারণ ওরা বিশ্বফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি। আর পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে লড়াই সব সময়ই অন্যরকম রোমাঞ্চ নিয়ে আসে। ব্যক্তিগতভাবে এটিই হতে যাচ্ছে ওদের বিরুদ্ধে আমার প্রথম ম্যাচ! আমি ফুটবল বিশ্বের প্রায় সবার বিরুদ্ধে খেললেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা বাকি ছিল, তাই আমার জন্য ম্যাচটি ভীষণ আনন্দের। আমরা ম্যাচটিকে একটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল হিসেবেই দেখছি এবং সেমিফাইনালে নিজেদের সেরাটা দিয়ে আবার লড়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েই মাঠে নামব।
মাঠের লড়াই তো বটেই, মাঠের বাইরেও আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবলীয় শত্রুতার ইতিহাস বড্ড দীর্ঘ এবং অম্লমধুর। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই আলোচিত 'হ্যান্ড অব গড' গোল এবং এরপর ফুটবল ইতিহাসের সেরা একক গোলটির স্মৃতি আজও ইংলিশ সমর্থকদের মনে কাঁটার মতো বেঁধে। আবার ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের সেই বিতর্কিত লাল কার্ড দুই দেশের বৈরিতায় নতুন এক মাত্রা যোগ করেছিল। মাঠের বাইরের এই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক চাপা উত্তেজনা আগামী রোববারের ফাইনালে ওঠার এই লড়াইয়ের পারদকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ নিয়ে মেসির ‘সসি’ মন্তব্য, ১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচের যা কিছু আমি দেখেছি বা মনে রেখেছি, তা কেবলই বিভিন্ন ভিডিও আর ছবি থেকে; যা আমরা আর্জেন্টাইনরা প্রতিনিয়ত দেখি এবং নতুন করে বাঁচি। তবে এই দলটা প্রতিপক্ষ কে, তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে কেবল নিজেদের ফুটবল খেলতেই অভ্যস্ত।
দুই দেশের এই স্নায়ুযুদ্ধ এবং ইতিহাস নিয়ে ম্যাচের পর অকপটে কথা বলেছেন আর্জেন্টিনার হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ। তিনি বেশ চনমনে গলায় বলেন, মাঠের বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি এমন একটি ম্যাচ যার পেছনে জড়িয়ে রয়েছে অনেক ইতিহাস, অনেক গল্প এবং অনেক বেদনা। কিন্তু আমরা পেশাদার খেলোয়াড়। আজ যেভাবে জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করেছি, শেষ পর্যন্ত সেভাবেই খেলব। ছোটবেলা থেকে যখনই ফুটবলে লাথি মেরেছি, ঠিক তখন থেকেই আমরা সবাই এই ধরনের ম্যাচে খেলার স্বপ্ন দেখেছি। এর চেয়ে বড় মোটিভেশন আর কিছু হতে পারে না।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইসদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে এক চোখধাঁধানো রকেট শটে গোল করা ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজও প্রতিপক্ষকে নিয়ে বেশ সতর্ক। অন্যদিকে ইংলিশ শিবিরে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদ সেনসেশন জুড বেলিংহাম, যিনি নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফর্মে বুক চিতিয়ে আছেন।
আলভারেজ বলেন, বিশ্বের সেরা চার দলের মধ্যে থাকতে পেরে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। আমরা জানি ইংল্যান্ড দলে বেশ কিছু দুর্দান্ত ও ইমপ্রেসিভ খেলোয়াড় রয়েছে। তারা এই বিশ্বকাপে খুব ভালো ফুটবল খেলছে। তবে এখন আমাদের দ্রুত রিকভারি করতে হবে এবং নিজেদের গেম প্ল্যান তৈরি করতে হবে।ন আগামী বুধবারের এই মহারণে শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনার উত্তরসূরিরা হাসে, নাকি টুখেলের শিষ্যরা ১৯৮৬ সালের প্রতিশোধ নেয়, তা দেখতেই এখন বুঁদ পুরো ক্রীড়াবিশ্ব!