লড়াই করাটা আর্জেন্টিনার রক্তে মিশে আছে: স্কালোনি

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ের নাটকের পর ৩-১ ব্যবধানের চোখধাঁধানো জয় তুলে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। আর এই রুদ্ধশ্বাস জয়ের পর আলবিসেলেস্তেদের হেড কোচ লিওনেল স্কালোনি বেশ চনমনে গলায় হুংকার দিয়ে বলেছেন, চরম ও দমবন্ধ করা চাপের মুখে কীভাবে ম্যাচ বের করতে হয়, আর্জেন্টিনা এখন সেই বিদ্যার আসল ওস্তাদ!

বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য কানসাস সিটির বিকেলটা ছিল চরম স্নায়ুক্ষয়ী। শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও যেভাবে ৩-২ ব্যবধানে রূপকথার জয় ছিনিয়ে এনেছিল স্কালোনির দল, ঠিক একইভাবে সুইসরাও তাদের একেবারে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল।

কিন্তু যখনই বাজি ধরার সময় এলো, ঠিক তখনই আর্জেন্টিনা তার আসল রূপ দেখাল, অতিরিক্ত সময়ে জোড়া গোলে সেমির টিকিট নিশ্চিত করল। এই খ্যাপাটে ঝড় সামলে ম্যাচ জেতার পর স্কালোনি বেশ রসিয়ে বলেন, আমরা জানতাম আমাদের ভুগতে হবে। আর এই লড়াই করা, এই কষ্ট পাওয়াটা আমাদের রক্তে আছে, এটা আমাদের ডিএনএর অংশ! আর এই বিশ্বাসটাই আমাদের মনে শান্তি এনে দেয়।

Lionel Scaloni 02
কেপ ভার্দে থেকে শেষ চার:
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নক-আউট পর্বের সফর মোটেও সোজা ছিল না, বরং ছিল কাঁটা বিছানো। শেষ ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দে-র বিরুদ্ধে দু’দুবার লিড হারিয়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে ম্যাচ জেতে তারা। এরপর মিসরের বিরুদ্ধে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর যে পাগলামি তারা দেখিয়েছে, তা তো ইতিহাস।

স্কালোনি বিশ্বাস করেন, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বজয়ের যে অমূল্য অভিজ্ঞতা এই দলটা পেয়েছিল, সেটাই আজকের আধুনিক ফুটবল কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। স্কালোনি অকপটে স্বীকার করেন, কাতারে আমাদের এবং স্বয়ং আমার নিজেরও অভিজ্ঞতার অভাব ছিল, তাই ওই ধরনের পরিস্থিতি সামলানো খুব কঠিন হতো। কিন্তু এখন আমরা অনেক বেশি অভিজ্ঞ। প্রতিপক্ষ কখন আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে, কখন তারা সমতায় ফিরছে, সব পরিস্থিতি এখন আমাদের চেনা। তাই আজ আমরা আমাদের মানসিক ভারসাম্য হারাইনি। দল শান্ত থাকতে জানত এবং আমরা তো কখনো হাল ছেড়েই দেব না।

Messi 02
আর্জেন্টিনার রিজার্ভ বেঞ্চের ম্যাজিক:  
ম্যাচের ৬৭ মিনিটে যখন সুইজারল্যান্ড সমতা ফেরায়, তখন মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার মিশন বুঝি এখানেই খতম! সুইসদের হাই-প্রেস আর শারীরিক ফুটবল আর্জেন্টিনার স্বাভাবিক পাসিং গেমের ছন্দ পুরোপুরি কেটে দিয়েছিল।

প্রতিপক্ষের প্রশংসা করে কোচ বলেন, ওরা বড্ড কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল। ওদের বিরুদ্ধে ওয়ান-টু-ওয়ান ডুয়েল জেতা কিংবা টানা ৫-৬টি পাস দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। মাঠের প্রতিটি প্রান্তে ওরা আমাদের কঠিন লড়াইয়ে ফেলেছিল, আমাদের বেশ ভালোই ভুগতে হয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ডাগআউটের রিজার্ভ বেঞ্চের জোর, সেটাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। স্কালোনির ট্রাম্প কার্ড, সুপার-সাব হুলিয়ান আলভারেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজ অতিরিক্ত সময়ে গোল করে কোচের আস্থার ষোলো আনা প্রতিদান দেন। স্কালোনি চওড়া হেসে বলেন, আমাদের বেঞ্চে এমন কিছু প্লেয়ার আছে যারা ম্যাচের পুরো দৃশ্যপট উল্টে দিতে পারে, যা দলের জন্য দারুণ এক শক্তির জায়গা। দিনশেষে আমরা একটা না একটা সমাধান ঠিকই খুঁজে বের করি।

Lionel Scaloni 03
সেট-পিস ম্যাজিক:
মানসিক দৃঢ়তার পাশাপাশি সেট-পিস থেকে আর্জেন্টিনার গোল করার দক্ষতারও আলাদা প্রশংসা করেন স্কালোনি। অধিনায়ক লিওনেল মেসির চোখধাঁধানো কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে অনবদ্য এক হেডে প্রথম গোলটি করেছিলেন মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে কোচ বলেন, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা। ওর জন্য সব প্রশংসাই কম মনে হবে, কারণ ও পর্দার আড়ালে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

এই হাড়ভাঙা খাটুনির জয়ের মাধ্যমে গত ৬টি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের প্রতিটিতেই সেমিফাইনালে ওঠার এক অবিশ্বাস্য ও ধারাবাহিক রেকর্ড গড়ল আর্জেন্টিনা। স্কালোনি আবেগী কণ্ঠে বলেন, আমি এভাবে আগে ভাবিনি, তবে এটি এমন এক পরিসংখ্যান যা নিয়ে আমরা সত্যিই গর্ব করতে পারি।

এই বিশ্বকাপ মিশন হয়তো আর্জেন্টিনার চেনা নান্দনিক ও ছন্দময় ফুটবলের জন্য মনে রাখা হবে না, তবে এটি মনে রাখা হবে তাদের জেদি ও একগুঁয়ে প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য। যেমনটা স্কালোনি ম্যাচ শেষে দারুণ এক লাইনে শেষ করলেন, আপনি যখন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছাতে চাইবেন, তখন আপনাকে ভুগতেই হবে। এই নরকযন্ত্রণা পার হয়েই আপনাকে ওপরে উঠতে হবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স-ইএসপিএন