ফ্রান্সের দম্ভ চূর্ণ করে দ্বিতীয়বার ফাইনালে স্পেন

সব সময় দানে দানে তিন দান হয় না। শুধু তাই নয়, ফিফা র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দলটি কখনও শিরোপা জয় করতে পারেনি। ফ্রান্স যেন এই দুইয়ের উদাহরণ হয়ে থাকলো। ফরাসিদের জন্য এবারও ভাগ্য বদলালো না, বরং ‘স্প্যানিশ খাঁচায়’ বন্দি হয়ে আরও একবার চূর্ণ হলো তাদের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন! সেই সঙ্গে বিলীন হলো লা ব্লুজদের টানা তৃতীয়বার ফাইনাল খেলে তৃতীয় শিরোপা জয়ের স্বপ্নও।

টেক্সাসের আর্লিংটনে মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে পা রাখলো স্পেন। এই নিয়ে টানা তিনবার ফরাসিদের কাঁদাল- লা রোজা’রা। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনাল এবং ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালের পর এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও ফ্রান্সকে মাটিতে নামিয়ে আনল তারা।

Spain Win 06
ম্যাচের শুরু থেকেই স্প্যানিশদের পারফরম্যান্স ছিল একদম নিখুঁত। প্রথমার্ধে মিকেল ওয়ারজাবালের পেনাল্টি এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে পেড্রো পোরোর চোখ ধাঁধানো গোলে ২-০ ব্যবধানের লিড নেয় স্পেন। আগামী ১৯ জুলাই ইস্ট রাদারফোর্ডে ইংল্যান্ড অথবা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বসেরার লড়াইয়ে নামবে এই ইউরো চ্যাম্পিয়নরা।

ম্যাচের শুরুতেই ডি-বক্সে লামিন ইয়ামালকে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় স্পেন, আর সেখান থেকেই গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ওয়ারজাবাল।

Spain Win 05
ম্যাচের প্রথমার্ধের প্রথম 'হাইড্রেশন ব্রেক' বা পানি পানের বিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের ডি-বক্সে ওপর থেকে নেমে আসা একটি বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের চারপাশের পরিস্থিতি ঠিকঠাক খেয়াল করতে পারেননি অ্যাস্টন ভিলার ফরাসি ফুল-ব্যাক লুকাস দিনিয়ে। বলটি বিপদমুক্ত করার জন্য তিনি যখন সজোরে পা চালান, তখন তিনি দেখতে পাননি যে বার্সেলোনার তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামাল পেছন থেকে তীব্র গতিতে ছুটে আসছেন।

দিনিয়ের আগেই ইয়ামাল বলের নাগাল পেয়ে যান, যার ফলে ফরাসি ডিফেন্ডারের পা সরাসরি আঘাত করে ইয়ামালকে। বার্সেলোনা তারকা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে দ্বিধা করেননি। স্পেনের হয়ে স্পট-কিক নিতে আসেন মিকেল ওয়ারজাবাল। নিখুঁত শটে গোল করে তিনি জাতীয় দলের হয়ে নিজের শতভাগ পেনাল্টি রূপান্তরের রেকর্ড অক্ষুন্ন রাখেন।

Spain Win 04
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়া ফ্রান্সের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পড়ে ম্যাচের ৩০ মিনিটে, যখন তাদের অন্যতম সেরা সেন্টার-ব্যাক সালিবা পিঠের ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। তার জায়গায় ক্রিস্টাল প্যালেসের ডিফেন্ডার মাক্সেন্স লাক্রোয়া মাঠে নামলেও ফরাসিদের রক্ষণভাগের ফাটল ঢাকা যায়নি।

পুরো ম্যাচজুড়ে স্পেনকে মনে হয়েছে এক অপরাজেয় মেশিন। বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল অলিস এবং উসমান দেম্বেলের মতো ফরাসি তারকাদের কার্যত পকেটবন্দি করে রাখে। ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করা ফ্রান্সের সামনে তখন ইতিহাস গড়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে মাত্র দুটি দল সেমিফাইনালে প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়ে জিততে পেরেছিল, ১৯৯০ সালে ইতালির বিপক্ষে আর্জেন্টিনা এবং ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়া।

Spain Win 03
ইতিহাস বদলাতে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মরিয়া ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম একের পর এক পরিবর্তন আনেন। আদ্রিয়েন রাবিওকে উঠিয়ে মানু কোনে এবং ব্র্যাডলি বারকোলার জায়গায় দেজিরে দুয়েকে মাঠে নামান। কিন্তু মাঠে নতুন মুখ এলেও ফ্রান্সের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্পেনের হাই-প্রেসিং ফুটবল এবং গোলরক্ষক উনাই সিমোনের অতিমানবীয় কিছু সেভের সামনে বারবার হতাশ হতে হয় ফরাসি ফরোয়ার্ডদের।

ফ্রান্সের সেই হতাশাকে চরম বিপর্যয়ে রূপ দেন পেড্রো পোরো। স্পেনের দুর্দান্ত এক দলীয় আক্রমণ থেকে ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁকে পরাস্ত করেন তিনি। স্কোরলাইন ২-০ হতেই ফ্রান্সের ম্যাচে ফেরার সব আশা কার্যত শেষ হয়ে যায়।

Spain Win 02
বাকিটা সময় দাপটের সাথে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে মাঠ ছাড়ে স্পেন। এই জয়ের মাধ্যমে টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থাকার ইতালির বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করল তারা। একই সাথে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন করল স্প্যানিশ আর্মাডা। ফ্রান্সের জন্য এই হার যেন এক চরম দুঃস্বপ্ন, আর স্পেনের জন্য ফুটবলের রাজত্ব পুনরুদ্ধারের মহাকাব্য!