বিশ্বকাপ চলাকালীন মেসির ওপর একাধিক হত্যার হুমকি!

উত্তর আমেরিকায় (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ চলার সময় একাধিক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হুমকি, বোমা হামলা, স্টকিং ও অনলাইন হয়রানির মতো গুরুতর ঘটনার তদন্ত করেছে যৌথ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। সম্প্রতি পুলিশের লিক হওয়া একটি গোপন নথি পর্যালোচনা করে এমনটাই জানিয়েছে স্প্যানিশ সংবাদপত্র- ‘ইনফরমাসিয়ন’। পরবর্তীতে ডেইলি স্টার ও দ্য মিররসহ বেশ কয়েকটি বিশ্বমানের গণমাধ্যমে নথিটি প্রকাশিত হলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।

ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়, টুর্নামেন্টজুড়ে সবচেয়ে বেশি যেসব উচ্চ-মাত্রার নিরাপত্তা অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য বা টার্গেট ছিলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি।


Messi Mess 01মেসিকে লক্ষ্য করে বোমার হুমকি:
স্প্যানিশ সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে জানা যায়, আয়োজক তিন দেশের যৌথ নিরাপত্তা দল বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রাখতে বাধ্য হয়েছিল। এর মধ্যে একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটে জর্ডানের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগে।

এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে ফোন করে দাবি করে, সে এবং আরও দুজন ব্যক্তি হোমমেড বোমা ও এআর-১৫ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সেই কলার শুধু পুলিশ ও দুই দলের খেলোয়াড়দের ওপরই আক্রমণের হুমকি দেয়নি, বরং বিশেষভাবে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ও ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসির নাম উল্লেখ করে হত্যার হুমকি দেয়।

অন্য আরেকটি বড় ধরণের ঘটনা ঘটে গত ৭ জুলাই আটলান্টায় মিশর ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ চলাকালে। লিক হওয়া পুলিশ রেকর্ডে উঠে এসেছে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সের এক ব্যবহারকারী পোস্ট করে লেখে, ‘আমি মাত্রই আটলান্টা স্টেডিয়ামে ঢুকছি, নিজের শরীরের সাথে চারটি বোমা বেঁধে মেসিকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য’।

ম্যাচটি চলার সময় আরও এক ব্যক্তি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে দাবি করে, স্টেডিয়ামের আশেপাশের ডাস্টবিনে তিনটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ডিভাইস লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ বোম ডিসপোজাল ইউনিট ও বিশেষ প্রশিক্ষিত স্নাইপার-ক্যানাইন টিম পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে সাঁড়াশি তল্লাশি চালায়।

Cristiano Ronaldo 02
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও স্টকিংয়ের চেষ্টা:
ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, পর্তুগাল অধিনায়ক ও মেগাস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকেও টুর্নামেন্টজুড়ে বাড়তি নিরাপত্তা কভারেজে রাখা হয়েছিল। এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি টুর্নামেন্ট চলাকালে রোনালদো কোন হোটেলে অবস্থান করছেন তা জানার চেষ্টা করলে এক ফিফা কর্মচারী সাথে সাথে নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক করেন।

হিউস্টন, টরন্টো এবং মায়ামিতে রোনালদোর কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য ভক্তদের নানা ঝুঁকিপূর্ণ চেষ্টার ঘটনা ঘটে। একটি ঘটনায় এক ব্যক্তি পর্তুগাল দলের সংরক্ষিত হোটেলে ঢুকে ৫ বারের ব্যালটে ডি'অর জয়ীর সাথে লিফটে ওঠার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে।

পরে জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশকে জানায়, সে শুধু একটি সেলফি তোলার জন্য ওই ঝুঁকি নিয়েছিল। এছাড়া পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের মাঝামাঝি সময়ে রোনালদোর নাম লেখা জার্সি পরা এক ভক্ত হঠাৎ নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়েছিলেন।

XX
রেফারি ও অন্য তারকাদের ওপর হুমকি:
পুলিশের এই নথিতে কেবল সুপারস্টারদের কথা নয়, রেফারি ও অন্যান্য খেলোয়াড়দের ওপর হওয়া ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্রও ফুটে উঠেছে।

রেফারিদের ওপর আক্রমণ: আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ শেষে ফ্রাঙ্কো রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেটেক্সিয়ার হোয়াটসঅ্যাপে ছয় হাজারের বেশি হুমকিমূলক বার্তা পান। একই সাথে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি উইলি ডেলাজোদ মৃত্যুর হুমকি ও অশালীন গালাগালের শিকার হন।

কিলিয়ান এমবাপ্পে: প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের ম্যাচের পর ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পেকে লক্ষ্য করে বর্ণবাদী ও উগ্র বার্তা ছড়ানো হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর একটি কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর ভিডিও পোস্ট করার ঘটনাও ঘটে।

অন্যান্য খেলোয়াড় ও কোচ: একটি নিশ্চিত গোল মিস করায় নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলোথ ও তাঁর স্ত্রীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অন্যদিকে পেনাল্টি মিস করে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার জামিনটন ক্যাম্পাজ এমন ভয়াবহ হুমকির মুখোমুখি হন যে, তিনি দলের অন্যান্যদের সাথে বাড়ি ফিরতে বাধার সম্মুখীন হন।

দক্ষিণ কোরিয়া দল: গ্রুপিং পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান কোচ হং মিয়ং-বো ও পুরো দক্ষিণ কোরিয়ান স্কোয়াডের ওপর মৃত্যুর হুমকি আসলে পুলিশ বিশাল একটি স্কট দিয়ে তাঁদের নিরাপদে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয়।

এফবিআই এবং সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ কো-অপারেশনের একটি বিশেষ যৌথ দল পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে খেলোয়াড়, ম্যাচ অফিসিয়াল ও তাঁদের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে চব্বিশ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছিল। সব মিলিয়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের নিরাপত্তাব্যবস্থা যেন ঝুলছিল একটা সুতায়।