বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার মসনদে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর যে রাজকীয় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়েও যেখানে ২০২৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদের জন্য তাঁর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ একপ্রকার নিশ্চিত বলেই ধরে নেয়া হচ্ছিল, সেখানে বর্তমানে ফিফার ২১০টি ভোটাধিকারপ্রাপ্ত সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র বিভক্তি।
বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টের স্বত্ব বা অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনয়োগকারীদের কাছে গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও বিতর্কিত পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ফুটবল বিশ্বে যে বিষাক্ত ঝড়ের সূচনা হয়েছে, তাতেই বদলে গেছে পুরো দৃশ্যপট। এই তীব্র ডামাডোলের মধ্যে বিবিসি স্পোর্ট বিশ্ব ফুটবলের ২১০টি সদস্য দেশের মনোভাব বিশ্লেষণ করে এক অগ্নিগর্ভ হিসাব কষেছে, যেখানে ইনফান্তিনোর সমর্থন ও বিরোধিতার এক উত্তপ্ত মানচিত্র ভেসে উঠেছে।
সংখ্যার সমীকরণে আপাতত ইনফান্তিনোর পাল্লা মারাত্মক ভারী ও বিপদজনক দেখাচ্ছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৭৩টি দেশ এখনো তাঁর পক্ষে থাকলেও, বিশ্বজুড়ে ১২৪টি দেশ তাঁর বিদায়ের দাবিতে সোচ্চার কিংবা বিরোধিতার অবস্থানে রয়েছে এবং ১৩টি দেশ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের মতো ফুটবল শক্তিগুলো ইনফান্তিনোকে দেওয়া সমর্থনের চিঠি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা, উত্তর আমেরিকার কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) যৌথ বিবৃতি দিয়ে ফিফা প্রধানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনেছে।
এই তিন মহাদেশীয় সংস্থার অধীনে রয়েছে ১৩৬টি ভোট, যা যে কোনো প্রার্থীকে মসনদ থেকে ছিটকে ফেলার জন্য যথেষ্ট। তবে এই বিশাল জোটের ভেতরেও ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছেন ইনফান্তিনো। কনকাকাফকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেক্সিকো প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর সমর্থন ঘোষণা করেছে, আবার এশিয়াতেও ফিলিপাইন, ভুটান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো তাঁর পাশেই অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচনে যে কোনো একক প্রার্থীকে জিততে হলে ১০৬টি ভোটের বা সাধারণ সংখ্যা গরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। ইউরোপের ৫৫, আফ্রিকার ৫৪, এশিয়ার ৪৬, উত্তর আমেরিকার ৩৫, ওশেনিয়ার ১১ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ১০টি ভোটের দৌড়ঝাঁপে মূল গেম-চেঞ্জার হতে পারে এশিয়া এবং ওশেনিয়া মহাদেশ।
ওশেনিয়া অঞ্চল এখনো মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলেও, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলো থেকে তিনি জোরালো সমর্থন পাচ্ছেন। কারণ তাঁর এক দশকের শাসনামলে ‘ফিফা ফরওয়ার্ড’ প্রকল্পের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অনুদান এই দরিদ্র বা তুলনামূলক ছোট ফুটবল দেশগুলোর ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। এছাড়া ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পাওয়া সৌদি আরবে চলতি মাসেই তাদের নিজস্ব ফুটবল বোর্ডের নির্বাচন রয়েছে, যার ফলাফল পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ভোটব্যাঙ্ককে নতুন দিকে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
ইনফান্তিনো নিজে থেকে পদত্যাগের বান্দা নন, তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যেই তাঁকে পদচ্যুত করার এক বিকল্প ছক আঁকা হচ্ছে। ফিফা কাউন্সিল কাউন্সিল বোর্ডে যদি ৩৭ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ১৯ জন জরুরি বৈঠকের ডাক দেন, তবে দুই সপ্তাহের মধ্যে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের রণশিঙা বেজে উঠতে পারে। অবশ্য ইউরোপ থেকে ৯ জন, এশিয়া থেকে ৭ জন, আফ্রিকা থেকে ৬ জন, কনকাকাফ ও কনমেবল থেকে ৫ জন করে সদস্যের হিসাব মেলালে কাউন্সিলে এমন অভ্যুত্থান ঘটানো কিছুটা কঠিন।
তবে নভেম্বর মাসের মধ্যে যদি উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তালিয়ানির মতো কাউকে একক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়, তবে ২০২৭-এর নির্বাচনে ইনফান্তিনোর সিংহাসন হাতছাড়া হওয়া প্রায় নিশ্চিত। এতদিন ধরে রাজকীয় স্টাইলে বিশ্ব ফুটবল শাসন করা ইনফান্তিনো এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ফুটবলের রাজপ্রাসাদে আপ্রাণ রাজনৈতিক মল্লযুদ্ধে নেমেছেন।