বুয়েনোস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে মঙ্গলবার রাতে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে যখন আকাশি-সাদা জার্সিতে জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক রূপকথাটি লিখে ফেললেন লিওনেল মেসি, তখন কেবল আর্জেন্টিনাই নয়, বিষাদের চাদরে ঢেকে গিয়েছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব। বিদায়ী ম্যাচে ১টি গোল ও ২টি চোখধাঁধানো অ্যাসিস্টে নিজের শেষ ‘লাস্ট ডান্স’ মাতানো ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল ঈশ্বরকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন ফুটবলের সর্বকালের সেরা তারকারা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী থেকে শুরু করে পরম সতীর্থ, সবাই মিলে মেতে উঠেছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিদায়ী বন্দনায়!
বার্সেলোনা ও পিএসজিতে মেসির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐতিহাসিক সাম্রাজ্য গড়া ব্রাজিলিয়ান মহাতারকা নেইমার জুনিয়র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তা পোস্ট করেন। নেইমার লেখেন, যারা ফুটবলকে ভালোবাসে, তারা এই দীর্ঘ বছরগুলোতে তোমার খেলা উপভোগ করেছে। আজ জাতীয় দলের জার্সিতে তোমার শেষ ম্যাচ; আমার আশা তুমি প্রতিটি সেকেন্ড উপভোগ করেছ। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ফুটবলকে তুমি যা দিয়েছ তার জন্য পুরো বিশ্ব তোমাকে ধন্যবাদ জানায়! ফুটবলকে আরও ভালোবাসতে শেখানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ, লিও। তোমার বিরুদ্ধে খেলতে পারাটা যেমন সম্মানের ছিল, তোমার পাশে দাঁড়িয়ে ইতিহাস গড়া ছিল তার চেয়েও বেশি গৌরবের।
মেসির উদযাপনের শুরুর দিনগুলোর সঙ্গী ও ব্রাজিলিয়ান জাদুকর রোনালদিনহো লিখেছেন, ভাই আমার, তোমার প্রথম দিন থেকেই এই রূপকথার অংশ হতে পেরে আমি আনন্দিত। তুমি আমাদের ফুটবল উপভোগ করতে শিখিয়েছ, হাসিয়েছ। তোমার নাম আজ শুধু তোমার দেশের নয়, পুরো পৃথিবীর ইতিহাসে খোদাই করা রইল। বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ‘এমএসএন’ (মেসি-সুয়ারেজ-নেইমার) ত্রয়ীর আরেক সদস্য লুইস সুয়ারেজও সতীর্থকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, তোমার কেরিয়ার এবং দেশের জন্য তুমি যা করেছ, তার এই রাজকীয় স্বীকৃতি তোমার প্রাপ্য ছিল। সবসময় গর্বিত থেকো।
শুধু বন্ধুরাই নন, মেসির শেষ নাচে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ ও ক্রোয়েশিয়া তারকা লুকা মদরিচও। মদরিচ বলেন, মেসিকে নিয়ে নতুন করে কী বলব? ও মাঠে ছেড়ে চলে যাচ্ছে ভেবে কষ্ট হচ্ছে, তবে ওর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো উচিত। ও যে বিশ্বকাপটি চেয়েছিল, তা জয় করেছে। রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা ক্রোয়েশিয়ার হয়ে ওর বিরুদ্ধে খেলতে গিয়ে প্রচুর কষ্ট পেতে হলেও, ওকে ফুটবল খেলতে দেখাটাই ছিল পরম আনন্দের। ও এক অনন্য তারকা!
স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে ২০০৫ সালের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বজয়ী সতীর্থ ও পরম বন্ধু আগুয়েরো প্রত্যক্ষ করেছেন মেসির এই ঐতিহাসিক বিদায়। আবেগ সামলে আগুয়েরো বলেন, জাতীয় দলের কঠিন সময়গুলোতে ও কতটা কষ্ট পেয়েছে, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ও হাসুক, কাঁদুক কিংবা মাতে পান করুক, আমরা সবসময় ওর পাশে থাকব। অন্যদিকে, আরেক বিশ্বজয়ী সতীর্থ আনহেল দি মারিয়া বলেন, ওকে এত শান্ত ও তৃপ্ত দেখতে পাওয়াটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। ও নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে, সারা জীবন আমাদের ওর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার মধ্য দিয়ে ফুটবল বিশ্বের এক অদ্বিতীয় সোনালী যুগের সমাপ্তি ঘটল। তবে নেইমার, রোনালদিনহো, সুয়ারেজ কিংবা মদরিচদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মেসি প্রমাণ করে গেলেন, জাতীয় সীমানা আর ক্লাবের রঙ ছাড়িয়ে তিনি সত্যিই পুরো ফুটবল বিশ্বের এক একক ঈশ্বর!
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান-টাইসম অব ইন্ডিয়া