১০ মিনিটের বিদায়ী ভাষণে যে বলে গেলেন মেসি

অবশেষে আকাশি-সাদা জার্সিতে দীর্ঘ দুই দশকের এক অবিশ্বাস্য রূপকথার চূড়ান্ত অবসান ঘটল। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে দিলেন। মঙ্গলবার রাতে বুয়েনোস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর মাইক্রোফোন হাতে যখন ১০ মিনিটের এক অশ্রুসজল বিদায়ী ভাষণ দিলেন ৩৯ বছর বয়সী এই অধিনায়ক, তখন থমকে গিয়েছিল পুরো বুয়েনোস আইরেস।

নিজের বিদায়কে ‘জীবনের সবচেয়ে বিষাদময় দিনগুলোর একটি’ হিসেবে আখ্যা দিলেও, দেশের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়ে শান্তি ও তৃপ্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন বলে জানান এই কিংবদন্তি।

Messi 01
ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যালারির আকাশ-বাতাস মুখরিত ছিল মেসি বন্দনায়। নিজের তিন সন্তান, ১৩ বছরের থিয়াগো, ১০ বছরের মাতেও এবং ৮ বছরের চিরোকে হাতে ধরে মাঠে প্রবেশ করেন মেসি। বিদায়ী মঞ্চেও ফুটবলের এই ঈশ্বর উপহার দিলেন জাদুকরী পারফরম্যান্স; সতীর্থদের দিয়ে দুটি গোল করানোর পর পেনাল্টি থেকে করেন নিজের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের ১২৬তম গোল। ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে দেশের হয়ে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় মূল আবেগঘন আনুষ্ঠানিকতা।

Messi 03
ম্যাচের ১০ম মিনিটে খেলা থামিয়ে আকাশ আতশবাজিতে ভরিয়ে দেওয়া, ফকল্যান্ড যুদ্ধের বীর সেনানির জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন কিংবা মাঠজুড়ে সুবিশাল ১০ নম্বর জার্সির প্রদর্শনী, সব কিছুই করা হয়েছিল ঘরের ছেলেকে সম্মান জানাতে। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পর যখন স্ত্রী অ্যান্তোনেলা ও সন্তানদের পাশে নিয়ে মেসি মাইক্রোফোন হাতে নিলেন, তখন কান্না সংবরণ করতে পারেননি মাঠে উপস্থিত ৮৫ হাজার দর্শকসহ সতীর্থ এনজো ফার্নান্দেজ, লিসান্দ্রো মার্তিনেস, রদ্রিগো ডি পল, আনহেল দি মারিয়া ও মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি।

Messi 05
মেসি কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘এই নীল-সাদা শার্টটিকে ধন্যবাদ জানানো ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে, এমনকি কঠিনতম মুহূর্তগুলোতেও আমি লড়াই থামাইনি, দলকে সামনে টেনে নিয়েছি এবং নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি। জাতীয় দলে আর ফিরতে না পারা এবং দেশের জার্সিতে খেলতে না পারাটা বুক জুড়ে ভীষণ কষ্ট দেবে। যদি সব কিছু আমার হাতে থাকত, তবে আমি সারা জীবন এই দলেই থেকে যেতাম; কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি’।

Messi 07
ভাষণে নিজের বিশ্বকাপ জয়ের অভিজ্ঞতা এবং ইংল্যান্ড ম্যাচের কঠিন লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে মেসি বলেন, ‘আগের বিশ্বকাপ আমাদের শরীর ও মন থেকে সব শক্তি শুষে নিয়েছিল। আমরা শেষ বিন্দু রক্ত দিয়ে লড়াই করে ফাইনালে পৌঁছেছিলাম। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটি ছিল প্রচণ্ড ধকলের, কারণ আমরা সেদিন মাঠের সব কিছু উজাড় করে দিয়েছিলাম। অনেক কথা বলা হলেও সেদিন অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুই ঘটেনি, আমরা শুধু নিজেদের সেরাটা দিয়ে লড়াই করেছিলাম। পরবর্তীতে ২০২২ সালে আমরা শুধু আমার নয়, পুরো দেশের স্বপ্ন পূরণ করে বিশ্বজয়ী হয়েছিলাম।

Messi 06
নিজের প্রয়াত বাবা হোর্হে মেসিকে স্মরণ করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মেসি বলেন, ‘আজকে এই কঠিন মুহূর্তে যে মানুষটির কথা আমার সবচেয়ে আগে মনে পড়ছে, তিনি আমার বাবা’। একইসঙ্গে দেশের সমর্থক এবং তরুণ খেলোয়াড়দের কঠিন সময়েও একতাবদ্ধ থাকার আকুল আহ্বান জানান তিনি।

সাতবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি বলেন, ‘আমি কখনো লড়াই থামাইনি, নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিতে কখনো কার্পণ্য করিনি। আমি আপনাদের সৃষ্টিকর্তার দোহাই দিয়ে বলছি- আমার ইচ্ছে করে জীবনের বাকিটা সময়ও এই দলের হয়ে খেলে যাই, কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না’।

Messi 04
তিনি আরও যোগ করেন, অনেকেই চাইবে আর্জেন্টিনা দল যেন হেরে যায়, কিন্তু তাদের সেই আনন্দ নেওয়ার সুযোগ দেয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, আজকের দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোর একটি, কারণ আজ আমি সবাইকে বিদায় জানাচ্ছি। তবে, আমি শান্ত ও তৃপ্ত হৃদয় নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। আমি আর্জেন্টিনা সন্তান হিসেবে গর্বিত’ এই কথা বলে নিজের ঐতিহাসিক বক্তব্য শেষ করেন ফুটবল ঈশ্বর। আর এর মধ্য দিয়েই ২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল, কাতার বিশ্বকাপ এবং দুটি কোপা আমেরিকা ট্রফির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের ইতি ঘটলো।

তথ্যসূত্র: দ্য সান