চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ল চার টন ওজনের রকেট!

মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটের প্রায় চার টন ওজনের একটি বিশালাকার অংশ অনিচ্ছাকৃতভাবে চাঁদের বুকে তীব্র গতিতে আছড়ে পড়েছে। গত বছর মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা রকেটটির ‘দ্বিতীয় পর্যায়’ বা ওপরের অংশটি দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশে ভেসে থাকার পর অবশেষে ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রায় ৮,৭৪৭ কিলোমিটার বেশি গতিতে চাঁদের পৃষ্ঠে ধাক্কা খায়। এই বিরল মহাজাগতিক সংঘর্ষে পৃথিবীর কোনো ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলেও বিজ্ঞানীরা এটিকে চাঁদের উপরিভাগ ও মহাকাশ বর্জ্য নিয়ে গবেষণার এক বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটটি দুটি বাণিজ্যিক রোবোটিক ল্যান্ডার নিয়ে মহাকাশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। উৎক্ষেপণের পর রকেটের প্রথম পর্যায় বা বুস্টারটি সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে এলেও, দ্বিতীয় পর্যায়টি ল্যান্ডার দুটিকে চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছে দেয়ার কাজ শেষ করে। কিন্তু মিশন শেষে দীর্ঘাকৃতির এই বেলুনাকার রকেটের অংশটিকে মহাকাশেই পরিত্যক্ত অবস্থায় ভাসতে ছেড়ে দেওয়া হয়।

Space X Accident 01
মহাকাশে কম-উচ্চতার কক্ষপথের মিশনগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত রকেটের ওপরের অংশটিকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। তবে, এই উচ্চ-শক্তিভিত্তিক মিশনে তা সম্ভব হয়নি। স্পেসএক্সের নাসা সাইন্স অ্যান্ড ড্রাগন প্রোগ্রামসের পরিচালক জুলিয়ানা শেইম্যান জানান, সৌর বিকিরণের তীব্রতা এবং বিভিন্ন গ্রহ-উপগ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জটিল মিথস্ক্রিয়ার কারণে রকেটের এই পরিত্যক্ত অংশটি ধীরে ধীরে চাঁদের অভিমুখে ধাবিত হতে বাধ্য হয়।

উল্লেখ্য, ওই রকেটে টেক্সাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেসের ব্লু গোস্ট ল্যান্ডার ও টোকিওভিত্তিক আইস্পেসের রেজিলিয়েন্স ল্যান্ডার ছিল। এর মধ্যে ব্লু গোস্ট ২০২৫ সালের মার্চ মাসে চাঁদে সফলভাবে অবতরণ করতে সক্ষম হলেও রেজিলিয়েন্স ল্যান্ডারটি কিছুদিন পর অবতরণে ব্যর্থ হয়।

Space X Accident 05
সংঘর্ষের প্রভাব ও বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ:
মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম সাধারণ তথ্যের ভিত্তিতে রকেটটির এই গতিপথ শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে নাসার ‘সেন্টার ফর নিয়ার আর্থ অবজেক্ট স্টাডিজ’ গতিপথটির সত্যতা নিশ্চিত করে। নাসার মুখপাত্র জিমি রাসেল এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন, এই ঘটনার কারণে পৃথিবীর কোনো বিপদ নেই। সংস্থাটি এই সংঘর্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং ভবিষ্যতে মহাকাশে থাকা যে কোনো বস্তুর গতিপথ ট্র্যাকিং করার প্রযুক্তি আরও নিখুঁত করবে।

বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, ১ সেকেন্ডের কম সময়ের এই তীব্র সংঘর্ষে চাঁদের বুকে সৃষ্টি হতে যাচ্ছে ৬৫ থেকে ৯০ ফুট (২০ থেকে ৩০ মিটার) ব্যাসের একটি নতুন খাদের। সংঘর্ষের স্থানটি চাঁদের আইনস্টাইন ক্র্যাটারের কাছাকাছি এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

Space X Accident 06
পৃথিবী থেকে খালি চোখে বা সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়ে এই মুহূর্তটি সরাসরি দেখা সম্ভব হয়নি। ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যা ও পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. পল উইগার্ট জানান, চাঁদের আলো ছড়ানো অংশে এটি আছড়ে পড়ায় সংঘর্ষের মুহূর্তের তৈরি হওয়া তীব্র আলো চাঁদের নিজস্ব উজ্জ্বলতায় ফিকে হয়ে গেছে। তবে রকেটের চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়া ধূলিকণা সূর্যের আলোতে আলোকিত হওয়ায় গবেষকরা বিশেষ টেলিস্কোপের মাধ্যমে তা পরোক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। নাসার 'লুনার রিকনসেন্স অরবিটার' পরবর্তীতে সংঘর্ষের স্থানের বিস্তারিত ছবি সংগ্রহ করবে।

মহাকাশ বর্জ্য ও ভবিষ্যৎ লুনার মিশনের জন্য বড় সতর্কবার্তা: সাধারণত নিয়মিত বিরতিতেই নানা আকারের উল্কাপিন্ড চাঁদে আছড়ে পড়ে। তবে, কোনো কৃত্রিম মানবসৃষ্ট বস্তু চাঁদে এভাবে সজোরে ধাক্কা খাওয়ার ঘটনা হাতে গোনা কয়েকবারই ঘটেছে। নাসা তাদের ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির মাধ্যমে চাঁদের বুকে দীর্ঘমেয়াদী মানব বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু পৃথিবীর মতো চাঁদের কোনো সুরক্ষামূলক বায়ুমণ্ডল না থাকায় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মহাকাশ বর্জ্য।

Space X Accident 03
ড. পল উইগার্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এত তীব্র গতির কোনো বস্তু যখন চাঁদে আছড়ে পড়ে, তখন পাথর ও ধূলিকণা প্রায় ৫০০ মাইল (৮০৫ কিলোমিটার) দূর পর্যন্ত বুলেটের গতিতে ছিটিয়ে পড়তে পারে। ভবিষ্যতে যখন চাঁদে নভোচারী বা গবেষণা সরঞ্জাম অবস্থান করবে, তখন এই ধরনের মহাজাগতিক বর্জ্যের আঘাত মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করতে পারে।

একইভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ম্যাট বোথওয়েল মহাকাশে জমে থাকা বর্জ্যের পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, কয়েক দশকের মধ্যে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে যে অতিরিক্ত ভিড় ও বর্জ্যের কারণে পৃথিবীর কক্ষপথ অতিক্রম করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাই নাসাসহ বিশ্বজুড়ে শীর্ষ মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো এখন থেকেই গভীর মহাকাশে পাঠোনো রকেটের অংশগুলোকে কীভাবে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া যায় বা ধ্বংস করা যায়, তার স্থায়ী আইনি ও প্রযুক্তিগত সমাধান খুঁজছে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন ও বিবিসি