বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতে এতদিন ধরে রাজত্ব করে আসা ইলন মাস্কের স্পেসএক্স এখন নিজের রকেটে অন্য কোম্পানির স্থান সংকুচিত করে নিজস্ব 'স্টারলিংক' স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণেই প্রধান নজর দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে মহাকাশ প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন মহাকাশে পৌঁছানোর জন্য স্পেসএক্সের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল, তবে প্রতিষ্ঠানটির এমন সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে পড়েছে বাণিজ্যিক অংশীদাররা।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোনাথন ম্যাকডোওয়েলের সংগৃহীত উৎক্ষেপণ ডেটা বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, স্পেসএক্সের মূল রকেট ফ্যালকন ৯-এর মোট মিশনের মধ্যে স্টারলিংকের অংশ বছর বছর চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে মোট উৎক্ষেপণের ৫৪ শতাংশ ছিল স্টারলিংকের, ২০২৬ সালে তা এক লাফে প্রায় ৭৯ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে অন্তত সাতটি মহাকাশযানের বাণিজ্যিক সংস্থার সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ২০২৮ বা ২০২৯ সাল পর্যন্ত ফ্যালকন ৯ রকেটের সব ধরণের মিশনে নতুন বুকিং নেওয়ার সুযোগ নেই বলে তাদের সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে স্পেসএক্স।
এই চরম জট বা সংকটের পেছনে মূল কারণ হলো স্পেসএক্সের পরবর্তী প্রজন্মের রকেট 'স্টারশিপ'-এ রূপান্তরের প্রক্রিয়া। স্টারশিপকে পুরোপুরি পুনঃব্যবহারযোগ্য এবং ফ্যালকন ৯-এর চেয়েও কম খরচে পরিচালনার জন্য নকশা করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পেসএক্সের হিসাবটি ব্যবসায়িক লাভের ওপর দাঁড়িয়ে। একটি স্টারশিপ মিশনে বাইরের গ্রাহকের স্যাটেলাইট পাঠালে স্পেসএক্স যে রাজস্ব পায়, তার নিজস্ব স্টারলিংক নেটওয়ার্কে নতুন স্যাটেলাইট যুক্ত করলে অর্জিত মুনাফা তার চেয়ে কয়েক কোটি ডলার বেশি হতে পারে।

মহাকাশ শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাশনাল ফিউচার্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও সাবেক নাসা কর্মকর্তা আখিল রাও বলেন, স্পেসএক্সের আসল দুর্লভ সম্পদ হলো তাদের নিজেদের উৎক্ষেপণ সক্ষমতা। এই ক্ষমতা যদি তারা বাইরের কোনো গ্রাহকের জন্য ব্যবহার করে, তবে নিজেদের স্যাটেলাইট পাঠিয়ে যে বিপুল মুনাফা করা সম্ভব ছিল, তারা মূলত তা হাতছাড়া করবে।
স্পেসএক্সের অর্থনৈতিক সাফল্যের মূলে এখন স্টারলিংক। গত বছর কোম্পানির মোট রাজস্বের ৬০ শতাংশই এসেছে এই উপগ্রহ ব্যবস্থা থেকে। ১০,০০০-এরও বেশি উপগ্রহ চালুর মাধ্যমে ২০২৫ সালে স্টারলিংক একাই ১১.৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যেখানে স্পেসএক্সের মূল স্পেস ও রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবসা থেকে এসেছে ৪.১ বিলিয়ন ডলার।
চলতি বছরের জুনে শেয়ারবাজারে আসা স্পেসএক্স তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসপেক্টাসে আগেই সতর্ক করে দিয়েছিল, তারা মার্কিন সরকার বা তৃতীয় পক্ষের গ্রাহকের তুলনায় নিজেদের পেলোডকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও বড়। তারা স্টারশিপ ব্যবহার করে স্টারলিংক নেটওয়ার্ক তো বাড়াবেই, একই সাথে মহাকাশের কক্ষপথে সৌরবিদ্যুৎ চালিত 'অরবিটাল এআই ডাটা সেন্টার' হিসেবে কাজ করার জন্য প্রায় ১০ লাখ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
এর পাশাপাশি, ২০২৮ সাল থেকে নাসার চন্দ্র অভিযানের ল্যান্ডার হিসেবে কাজ করার জন্য স্পেসএক্সের সাথে বিলিয়ন ডলারের চুক্তি রয়েছে, যার আওতায় মহাকাশে একাধিকবার রিফুয়েলিং এবং পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করতে হবে।
এসব কারণে স্টারশিপ বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি চালু হলেও প্রথম কয়েক বছর বাইরের গ্রাহকদের জন্য খুব বেশি ফাঁকা স্থান অবশিষ্ট থাকবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই বাজারের যে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের কম খরচে সার্ভিস না দিয়ে নিজেদের ডাটা সেন্টার মহাকাশে পাঠানোই মাস্কের জন্য প্রধান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার।

রকেটের বাড়তি খরচ ও প্রতিযোগীদের বেহাল দশা: এক সময় আমেরিকান মহাকাশ খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করা ফ্যালকন ৯-এর উৎক্ষেপণ খরচ ২০১৩ সালের ৫৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে।
স্পেসএক্সের এমন একচেটিয়া নীতি এবং উৎক্ষেপণের উচ্চ খরচের কারণে যেসব ছোট স্টার্টআপ বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রকেট নেই, তাদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন, বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতের নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য 'মৃত্যুর উপত্যকা' এখন আরও বহুগুণ গভীর ও জটিল হয়ে দেখা দেবে।
অন্যদিকে, স্পেসএক্সের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে ওঠার মতো প্রতিযোগী বিশ্ববাজারে প্রায় অনুপস্থিত:
ব্লু অরিজিন: জেফ বেজোসের পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট 'নিউ গ্লেন' গত মে মাসে লঞ্চপ্যাডে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শিকার হয়ে বছরের শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি গ্রাউন্ডেড অবস্থায় রয়েছে।
ইউনাইটেড লঞ্চ অ্যালায়েন্স: বোয়িং এবং লকহিড মার্টিনের এই যৌথ উদ্যোগের 'ভালকান' রকেটও বুস্টারজনিত সমস্যার কারণে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ।
রকেট ল্যাব: বাণিজ্যিক উৎপাদনে স্পেসএক্সের ঠিক পেছনেই থাকা এই সংস্থাটি তাদের নতুন রকেট 'নিউট্রন' তৈরি করছে। একই সাথে ৮ বিলিয়ন ডলারে 'ইরিডিয়াম' নামের একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ সংস্থা অধিগ্রহণের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা, যাতে নিজস্ব ক্লায়েন্টদের নিরবচ্ছিন্ন সার্ভিস প্রদান করা যায়।
যেখানে অন্যান্য প্রতিযোগী সংস্থাগুলো তাদের উৎক্ষেপণ সমস্যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে স্পেসএক্স নিজের অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধিকেই প্রাধান্য দিয়ে পুরো মহাকাশ প্রযুক্তির বাণিজ্যিক মডেলটিকে নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
