জন্মদিনে ভালোবাসায় সিক্ত খ্যাতিমান সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ

বয়স ৮০ ছুঁয়েছে; কিন্তু এখনো তিনি তরুণ। যেখানে ভালো উদ্যোগ, নিজেকে নির্দ্বিধায় যুক্ত করে নেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশে নিজেকে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করেন। আবার অসাম্প্রদায়িকতার উপর আঘাত এলে কিংবা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র হলে প্রতিবাদে তিনি রাস্তায় নেমে পড়েন। প্রচুর পড়াশোনা করেন, লেখেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখাতে কথা বলেন। তিনি খ্যাতিমান সাংবাদিক, প্রবাসে বাংলা সাংবাদিকতার বাতিঘর সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ।

ব্যাপক আয়োজন এবং বিপুল সুধী সমাগমের মধ্য দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ এই বরেণ্য এই ব্যক্তিত্ব।

গত ৩১ অক্টোবর ৮০ বছর বয়সে পা রাখেন সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ। সেই উপলক্ষে সম্প্রতি নিউইয়র্কের লাগোর্ডিয়া ম্যারিয়ট হোটেলের হলরুমে চমৎকার একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ সংবর্ধনা পর্ষদ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

কমিউনিটি নেতা, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ২৮ সদস্যের সেই কমিটি সেদিন উপহার দিয়েছে উজ্জ্বল ও পরিচ্ছন্ন একটি অনুষ্ঠান। এতে বিশিষ্ট-জনেরা বক্তব্য রাখেন। এছাড়া ছিলো স্মারক প্রদান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সেই সঙ্গে ছিল সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহর আবেগ ঘন আত্মকথন। নিজেকে যেন মেলে ধরেছিলেন তিনি।

স্ত্রী দিলরুবাকে পাশে নিয়ে তিনি বলছিলেন তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। মিলনায়তন জুড়ে তখন অন্য এক নীরবতা। সবাই মন দিয়ে শুনেছেন তার কথা। সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ তার জীবনের সাফল্য, ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন। বলেন, মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার কথা। অবশ্য জীবনের সাফল্যকে তিনি ‘নিছক দুর্ঘটনা’ হিসেবে তুলে ধরেন। বলেন, যতটা পাওয়া গেছে, সেই সাফল্য তার পাওয়ার কথা ছিল না।

বিনয়ী এই মানুষটি জানান, চট্টগ্রামে তার সাংবাদিকতায় যোগ দেয়া। এরপর বাংলাদেশ যখন স্বাধীন জয় তিনি জীবিকার সন্ধানে চলে যান রাজধানী ঢাকায়। সেখানে সাংবাদিকতার একটি চাকরিও পেয়ে চান। সদ্য স্বাধীন দেশে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পরে তার উপর। এক পর্যায়ে সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সুযোগ পান। আর এই বিষয়টিকেই তিনি ‘অকল্পনীয়’ বলে উল্লেখ করেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে যোগ দেয়ার সংবাদ সংগ্রহ করতে যান নিউইয়র্কে। সেবার প্রথমবার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। জাতির পিতার বাংলায় দেয়া সেই ঐতিহাসিক ভাষণের সাক্ষী তিনি।

দেশে ফিরে যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। তখন পাকাপাকিভাবে চলে আসেন নিউইয়র্কে। জীবনের অলি গলি হাতরে তিনি বলে যান কথাগুলো। তখন সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো কেবল শুনছে। কখনো বলতে বলতে গলা ধরে আসে তার। কখনো অশ্রু ধরে রাখতে পারেন না। করতালি আর ভালোবাসায় ভাসিয়ে দেন দর্শক শ্রোতা। অনেকটা ফুলের স্তূপে চাপা পড়েন বরেণ্য এই সাংবাদিক। এ সময় সকলকে সঙ্গে নিয়ে কেক কাটেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক ছিল ‘দিগন্ত’। দ্বিতীয় পত্রিকা হিসেবে সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ ‘প্রবাসী’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা বের করেন। পরে তা সাপ্তাহিক হিসেবে বেশ কয়েক বছর প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিক ‘প্রবাসী’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে সবসময় আপসহীন ছিল। মূলত সেই পথ ধরেই পরবর্তীকালে নিউইয়র্ক থেকে অনেকগুলো বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় তাকে শুভেচ্ছা জানান ভয়েস অব আমেরিকার বরেণ্য সাংবাদিক সরকার কবির উদ্দিন ও রোকেয়া হায়দার। উত্তরীয় পরিয়ে দেন সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব মুত্তালিব বিশ্বাস ও টিভি ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ। অনুষ্ঠানে ফখরুল আলমসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন।

আরও পড়ুন: রমনায় হাঁটতে গিয়ে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নারীর মৃত্যু

ফখরুল আলম এমন একটি অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, জীবিত অবস্থায় ভালো কাজের স্বীকৃতি পেলে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হন আলোর পথে জোরালোভাবে ধাবিত হবার জন্যে। সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহকে সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে সে দায়িত্বটি পালনে একদল সমাজ-সংগঠক সোচ্চার হয়েছেন, আমিও ছিলাম তাদের সাথে।

সঙ্গীত পরিবেশন রবীন্দ্রনাথ রায়, শহীদ হাসান, শাহ মাহবুব। নৃত্য পরিবেশন করেন জেরিন মাইশা, লিওনা মুহিত। দলীয় নৃত্যে অংশ নেন অন্তরা সাহা, মেঘা সরকার, আনিশা মির্জা এবং অবনী। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন গোলাম মোস্তফা এবং সাবিনা শারমিন। সংবর্ধনা উপলক্ষে একটি বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়।


একাত্তর/আরএ