বয়স আর প্রচণ্ড শীতকে যেনো গুরুত্বই দিলেন না। তার উপর ছিল কোভিড-১৯ এর নতুন সতর্কতা। এরপরও তিনি এলেন, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন 'জয় বাংলা' শ্লোগানে মুখরিত করে তুললেন, কাঁদলেন, আবেগতাড়িত হলেন। তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু লিয়ার লেভিন। জীবন বাজি রেখে যার তোলা ভিডিওচিত্র দিয়েই নির্মিত হয়েছিল অমর সৃষ্টি 'মুক্তির গান'। ম্যাসাচুসেটস এর বস্টন থেকে তিনি নিউইয়র্কে আসেন মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।
মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে নিউইয়র্কসহ গোটা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজনে চলছে নানা অনুষ্ঠানমালা। রোববার (১৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের একটি মিলনায়তনে আয়োজিত মুক্তধারার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি নুরুল হুদা। সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন লিয়ার লেভিন।
অনুষ্ঠানে লিয়ার লেভিন মুক্তযুদ্ধকালীন তার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার দিনগুলোর কথা তুলে ধরেন। কিভাবে তিনি সেই ভিডিও পরবর্তীতে সংরক্ষণ করেন, কিভাবে তারেক মাসুদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলো এবং নির্মিত হলো অসাধারণ একটি চলচ্চিত্র, সেইসব কথা তুলে ধরেন। কথা বলতে বলতে বার বারই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ছিলেন তিনি। লিয়ার লেভিন বলেন, ;বাংলাদেশের মানুষ আমাকে যেভাবে আমাকে করে যাচ্ছে তাতে আমি অভিভূত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ'। পরে অনুষ্ঠানের শেষের অংশে তিনি বার বার 'জয় বাংলা' শ্লোগানে মুখরিত করে তোলেন। উপস্থিত প্রবাসীরাও তার শ্লোগানে কণ্ঠ মেলায়।
অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক কবি নূরুল হুদা বলেন, 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ আমরা বলে থাকি পৃথিবীর অন্যতম সেরা ভাষণ। কিন্তু আমি মনে করি, পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতার পক্ষে সাধারণ মানুষের পক্ষে এর চেয়ে অনন্য ভাষণ পৃথিবীতে নেই। তিনি আরো বলেন, "স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। আমি মনে করি এক অর্থে এটি স্বাধীনতারও শতবর্ষ। কারণ বঙ্গবন্ধু না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, তাই আমি মনে করি, যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন সেদিনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার শুরু"।
বহির্বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী লেখালেখি করার মানুষদের নিয়ে তিনি বলেন, "আমি মনে করি প্রবাসী বলে কিছু নেই। আমি মনে করি আমরা সবাই বিশ্ব বাঙালি। বাংলা ভাষার যেকোন লেখককে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে গুণগত মানের বিবেচনায় দেখা উচিত"।
মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কার্যকরী কমিটির সদস্য সউদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরো বক্তব্য রাখেন প্রাবন্ধিক-গবেষক আহমাদ মাযহার। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বিশ্বজিত সাহার পরিচালনায় দেড়ঘন্টার এই অনুষ্ঠানের শেষে ছিল সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব। এই পর্বে অংশগ্রহণ করেন কবি ফকির ইলিয়াস ও ঠিকানা পত্রিকার সাঈদ-উর রব।
অনুষ্ঠানের সভাপতি মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কার্যকরী কমিটির সদস্য সউদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের জন্য মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ২০১৬ সাল থেকে যে কর্মসূচী পালন করে আসছে তারই সর্বশেষ অনুষ্ঠান ছিল ১৯ ডিসেম্বরের এই অনুষ্ঠানটি। এই ৬ বছরের পথ পরিক্রমায় মুক্তধারা ফাউন্ডেশন কোভিড অতিমারির আগের ৪ বছর (২০১৬-২০১৯) একটানা মূলধারার রাজনীতিকদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস শোভাযাত্রার আয়োজন করে এসেছে। ২৬ মার্চ ২০২১কে নিউ ইয়র্ক স্টেটের আইন পরিষদ কর্তৃক ‘বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেটস ডে’ ঘোষণার রেজুলেশন পাশ ছিল মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রচেষ্টার এক গৌরবোজ্বল অর্জন। উল্লেখ্য, ২৬ মার্চ ২০২১ মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজন করে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আগামী দিনের বাংলাদেশ’ শীর্ষক মুক্তধারা ভাষণ ২০২১।
অনুষ্ঠানের শুরুতে লিয়ার লেভিন ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে পুষ্পস্তবক প্রদাণ করেন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা ও প্রচার সম্পাদক লেখক আদনান সৈয়দ এবং কার্যকরী কমিটির সদস্য জাকিয়া ফাহিম।
একাত্তর/এসএ